1. admin@bdtimes24.live : admin :
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা চাইলেন জামায়াত আমির সাইবার বুলিং ও অপতথ্য রুখতে তারেক রহমান সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ স্বপ্নের ফ্ল্যাটের প্রত্যয়ে স্বপ্ন শহর প্রোপার্টিজের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কানাডায় জমজমাট প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির অ্যালামনাই গেট-টুগেদার স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজের ৫৪তম বোর্ড বৈঠক অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের এএলএম কমিটির সভা অনুষ্ঠিত সাইবার আক্রমণ ঠেকানোর প্রশিক্ষণে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে বুটক্যাম্প সোনার বাংলা গড়ার নামে পরিবেশ বিপর্যয়: সাভারের কামালপুরে বন ও কৃষিজমি গিলে খাচ্ছে তথাকথিত রিসোর্ট বিএনপির ট্যাগ নিয়ে রুমিন ফারহানার ফেসবুক পোস্টে নতুন বার্তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত: ডেপুটি স্পিকার

প্রাচ্যের রানী চট্টগ্রাম

আহসান হাবিবঃ
  • প্রকাশে সময় : মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৪
  • ৩৮৩ বার পঠিত

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়, সমুদ্র আর উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য চট্টগ্রামকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের রানী’। আর রানীর ওপর আক্রমণও এসেছে বারবার। যেহেতু অঞ্চলটি আলাদা করে কোনো রাজ্যের অধীনে ছিল না, ফলে বারবারই এর শরীরে আঁচড় লেগেছে বাইরের। তাছাড়া চট্টগ্রামে আছে একটি প্রাচীন সমুদ্র বন্দর। পর্যটক স্ট্রাবোর বর্ণনানুযায়ী খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকেই চট্টগ্রাম বন্দরকে ধরা হতো আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে।

আরব বণিকেরা এ বন্দরে নোঙ্গর করে সারা বাংলায় বাণিজ্য করতেন। শুধু আরব বণিকেরা নয়, চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ। সুতরাং একের পর এক বহিঃশক্তি এ অঞ্চলকে শাসন করবে সেটিই স্বাভাবিক। তাই বিভিন্ন সময়ে বণিকরা চট্টগ্রামকে বিভিন্ন নামে ডাকত। যেমনÑ পেন্টা পোলিশ, জালন্ধর, সামন্দর, চিটাগুং, চাটিগ্রাম, কর্ণবুল, চন্দ্রনাথ, সীতাগঙ্গা, রোসাঙ্গ, ফদহ-ই-আবাদ, ফতেয়াবাদ, পোর্টো গ্রান্ডে, শাৎগাঙ বা শাৎগাঁও, চাটগা বা চাটিগাঁও, চট্টল, রামেশ, চার্টিগান, জেটিগা, পার্বতী, পুষ্পপুর, চিটাগাং ইত্যাদি।

চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে অনেক বড় বড় লেখক বই লিখেছেন। অনেকেই চট্টগ্রামকে নিয়ে গবেষণাও করেছেন। কোনো কোনো লেখক তাদের বইয়ে চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তনের কথা লিখেছেন বহুবার। কেউ বত্রিশ, কেউ ছত্রিশ আবার কেউ লিখেছেন আটচল্লিশবার। গবেষকরা তাদের গবেষণায় বলেছেনÑ এসব নাম এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পরিব্রাজক, ভূগোলবিদ এবং পণ্ডিতদের লিখিত বিবরণে, অঙ্কিত মানচিত্রে, শাসক সুলতান, রাজা, বাদশাদের মুদ্রায় খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে চট্টগ্রাম নগরীর সমতুল্য বোধহয় এ পূর্ববঙ্গে আর দ্বিতীয়টি নেই। পাহাড় ঘেরা, সমুদ্রঘেরা এ অঞ্চলটি সৌন্দর্যের দিক থেকে যেমন ঈর্ষণীয়, অর্থনৈতিকভাবেও তেমনই সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। আবার নগরী হিসেবেও এর ইতিহাস, ঐতিহ্য হাজার বছরের প্রাচীন। যে কারণে এর নামও বদলেছে বারবার। যখন যে শক্তি শাসন করেছে, এ জনপদের নামকরণও তাদের ইচ্ছেমতোই হয়েছে। ফলে নথিপত্র, ইতিহাস, স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে বৈচিত্র্যময় নানা নাম।

গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর মতে, ছত্রিশবার নাম বদল হয়েছে চট্টগ্রামের। এর মধ্যে সতেরটি নাম খুঁজে পেয়েছেন তিনি। চৌধুরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি তার বইয়ে চট্টগ্রামের বত্রিশ নামের উল্লেখ করেছেন। অন্য গবেষকরা বলেছেন, না- তার চেয়েও বেশিবার নাম বদল হয়েছে চট্টগ্রামের। কারও মতে, এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের আটচল্লিশটি নাম পাওয়া গেছে।

প্রায় শতাধিক বছর আগে চৌধুরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস বিষয়ক প্রথম বই। এখানে চৌধুরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি একটি উত্তর রেখে গেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘প্রকৃতির লীলাভূমি ‘শৈলকিরীটিনী’ ‘সাগরকুন্তলা’ চট্টলভূমি ভারতের সুদূর পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। ইহার নৈসর্গিক সৌন্দর্য এমন মনোহরী যে, বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ভ্রমণকারী ও ভাবগ্রাহীরা ইহাকে আপনাদের মনঃপুত কত কত বিভিন্ন নামে অভিহিত করিয়াছেন তাহা নির্ণয় করা কঠিন।’

ঐতিহাসিক যুগে চট্টগ্রাম কোনো একক রাজা বা বাদশার অধীনে ছিল না। চট্টগ্রাম বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন শাসকের অধীনে ছিল। ফলে চট্টগ্রামের কোনো একক ইতিহাস তৈরি হয়নি। দখলদার শাসকদের ইতিহাসে প্রাসঙ্গিকভাবে বর্তমান চট্টগ্রামের অঞ্চলের নাম এসেছে, তাদের ইচ্ছেমতো নামকরণ করেছে। দখলদারদের ইতিহাস থেকে খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন চট্টগ্রামের হরেক রকম নাম। এ ইতিহাস জটিল, এ ইতিহাস বেদনার। বর্মী ইতিহাস অনুসারে খ্রিষ্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে এ জনপদ ছিল বৌদ্ধ রাজাদের শাসনাধীনে। আর চট্টগ্রামের বাঙালি বৌদ্ধরা মনে করেন, প্রাচীনকালে এখানে অসংখ্য বৌদ্ধ চৈত্যের অবস্থান ছিল বলে এই স্থানের নাম চৈত্যগ্রাম। চৈত্য অর্থ মন্দির বা বিহার। কারও কারও ধারণা, বৌদ্ধদের স্বর্ণযুগে শহর ও আশপাশের এলাকাকে আরাকানিরা ‘চিটাগুং’ নামকরণ করেন। আরেকটি প্রাচীন নাম, ‘জালন্ধর। জালন্ধরীপা নামে এক বৌদ্ধ সিদ্ধপুরুষ এই নাম দিয়েছেন। সাংবাদিক ও গবেষক জামাল উদ্দীন তার ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস বইয়ে লিখেছেন, জনপদটিতে না-কি গরম জল প্রবাহিত হতো।

তিব্বতি ঐতিহাসিক সুম্পা খান পো তার ‘পাকসাম জোন-জান গ্রন্থে লিখেছেন, সেকালে এ ভূখণ্ডে কোথাও কোথাও ভূগর্ভস্থ আগুনের তপ্ত জলধারা নিঃসৃত হতো বলেই নামকরণ এমন হয়েছিল। কালক্রমে এ নাম বিবর্তিত হয়ে ‘জলন্দর বা ‘জালন্ধর’ নামে খ্যাত হয়।

আরব্য ভৌগোলিক খুরদাদ বিহ তার ‘কিতাবুল মসালিক আল সমালিক’ বইয়ে এ অঞ্চলকে উল্লেখ করেছেন সামন্দর নামে। ‘সাম’ মানে আগুন আর ‘আন্দোর’ মানে ভেতর। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, বারবকুণ্ড এলাকার কোনো কোনো পাহাড় থেকে এখনও এ গরম জল প্রবাহিত হয়!

জামাল উদ্দীন তার ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে এক রাখাইন গবেষকের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা আরাকান রাজাকে গভীরভাবে অনুতপ্ত করে তোলে। চট্টগ্রাম পৌঁছে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে আর যুদ্ধ করবেন না। সেভাবেই ‘চিৎ-তৌ-গৌং’ কথাটি বিকৃত হয়ে বিজয় স্তম্ভের আশপাশের জনপদের নাম হয় ‘চাটিগাঁ’। গৌড়ের রাজা গনেশ বা দনুজ মর্দন এবং রাজা মহেন্দ্র দেবের সময়ে তৈরি মুদ্রার টাকশালে ‘চাটিগ্রাম’ নামটি পাওয়া যায়। দশম শতকেই আরব্য বণিকেরা চট্টগ্রামে আসা শুরু করে। তারা এ জনপদকে ‘শাৎগাঙ’ বা ‘শাৎগাঁও’ নামে ডাকত। তবে এগার শতকের আরব্য ভ্রমণকারী আল ইদ্রিসীর বইতে কর্ণফুলী নদীর নামানুসারে এ জনপদের নাম লেখা আছে ‘কর্ণবুল’। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আসাম ও বাংলা ভ্রমণ করেন। তার ভ্রমণ কাহিনিতে এ জনপদের নাম তিনি লিখেছেন ‘সোদকাওয়ান’ বা ‘সতের কাউন’।

চট্টগ্রামে কুলীন ব্রাহ্মণদের বসবাস বেশি ছিল, যাদের পদবি ছিল চক্রবর্তী ও চট্টোপাধ্যায়। তাদের প্রভাবে এ অঞ্চলের নাম হয় ‘চট্টল’ বা ‘চট্টলা’। আবার খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়াং-সাংও এ জনপদের নাম ‘শ্রী চট্টল’ বলে বর্ণনা করেছেন।
আরাকানবাসীদের দেয়া চট্টগ্রামের আরেকটি প্রাচীন নাম ‘রোসাঙ্গ’। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্ব তীর থেকে নাফ নদীর উত্তর তীর পর্যন্ত এলাকা ‘রোসাঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগে চট্টগ্রাম ছিল আরাকানি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। আরাকানবাসীরা চট্টগ্রামকে ‘আনক’, ‘আনফ’ বা ‘পশ্চিম দেশ’ নামে ডাকত। এছাড়া অনেকদিন মগ ও ত্রিপুরা রাজার শাসনাধীন থাকার কারণে একে ‘পদ্মাবতী’ নামেও ডাকা হতো চট্টগ্রামকে। হোসেন শাহের ছেলে নুসরত শাহ ১৫১৩ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করেন। তিনি এর নাম দেন ‘ফদহ-ই-আবাদ’। যা ‘ফতেয়াবাদ’ নামে পরিচিতি পায় পরে। এরপর ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম অধিকার করলে তিনি আওরঙ্গজেবের ইচ্ছেনুসারে এর নাম রাখেন ‘ইসলামাবাদ’।

ইতিহাসবিদ নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, সেটি বর্তমানের সন্দ্বীপ। ইতিহাসবিদ ল্যাসেনের ধারণা, সেখানে উল্লিখিত ‘পেন্টা পোলিশ’ আদতে চট্টগ্রামেরই আদিনাম। তবে হারুনর রশীদের ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, কাতাবেদা, ‘পেন্টাপোলিশ’ আর ‘গাঙ্গে’ এ সবই চট্টগ্রামের আরেক নাম।

তুর্কি সুলতান সোলায়মানের রেডফ্লিটের ক্যাপ্টেন সিদি আলী চেহেলভি ১৫৫৪ খ্রিষ্টাব্দে জাহাজে ভারত মহাসাগরের আশপাশের দেশগুলো ভ্রমণ করেন। সেসময় তিনি আরাকান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন। ভ্রমণ কাহিনিতে তিনি চট্টগ্রামের নাম ‘শাতজাম’ লিখেছিলেন। এর আগে পরিব্রাজক রালফ ফিচ ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম পরিভ্রমণ করেন। তার লিখিত ভ্রমণ কাহিনিতে চট্টগ্রামের নাম ‘চার্টিগান’ লেখা আছে। ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে ফ্যান্ডেন ব্র“ক অঙ্কিত মানচিত্রে চট্টগ্রামের নাম ‘জেটিগা’ রূপে লেখা আছে। মীর কাশিম আলী খানের কাছ থেকে এ জেলাটি অধিগ্রহণের পর ব্রিটিশরা এর নামকরণ করেন ‘চিটাগাং’। ইতিহাসবিদ আবদুল করিম লিখেছেন, এ জনপদের নামকরণ ‘চট্টগ্রাম’ হয় উনিশ শতকে। এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোনসের মতে, এ অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর খুদে পাখি ‘চটগা’ থেকে ‘চট্টগ্রাম’ নামের উৎপত্তি।

বলা বাহুল্য, গবেষক ও ইতিহাসবিদগণ এসব নাম নিয়ে নানা মতভেদ রেখেছেন। ঠিক কোন নাম থেকে আজকের এ চট্টগ্রাম তা সত্যি বলা দায়। পাতঞ্জল সূত্রে চট্টগ্রামকে ‘আদর্শ দেশ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে বলে জানা যায়। পৌরাণিক গ্রন্থে এ জনপদকে ‘সূক্ষ্ম দেশ’ নামে ডাকা হয়েছে। মহাকবি নবীন চন্দ্র নাম রেখেছেন ‘চট্টল’ ও ‘পার্বতী’। কর্নেল উইলফোর্ডের মতে এ জনপদের নাম ছিল ‘পুষ্পপুর’। আরেকটি পুরাতন বইয়ে চট্টগ্রাম ‘চক্রশালা’ নামে পরিচিত। আর তা হবেই বা না কেন? প্রাচ্যের ভেনিস হিসেবে পরিচিত ঢাকা হলো পৃথিবীর অন্যতম এক প্রাচীন নগরী। যার বয়স চারশোর কিছু বেশি। অথচ, প্রাচ্যের রানী নামে খ্যাত চট্টগ্রাম নগরী তারও ছয়শো বছর আগের প্রাচীন নগরী।

খ্রিষ্টীয় সপ্তম অষ্টম দশক থেকেই এ জনপদের ইতিহাস পাওয়া যায় বিভিন্ন পর্যটক, ব্যবসায়ী বণিক আর বিদেশি লেখকদের বিবরণীতে। আর মুসলমান পীর-ফকিররা চট্টগ্রামকে বলে থাকেন ‘বার আউলিয়ার দেশ’।

 

Facebook Comments Box

এই জাতীয় আরও খবর