
ময়মনসিংহের ভালুকায় বারি-১ মাল্টা চাষে বৈপ্লবিক সাফল্য দেখছেন অনেকেই। মাল্টা চাষে খরচ কম, সুবিধাজনক ও ঝুঁকিমুক্ত, বাজারেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। অন্যান্য ফসল ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মাল্টার তেমন ক্ষতি হয় না। তাই অনেকেই স্থায়ী ভাবেই মাল্টা চাষে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন স্থানীয় ভাবে মাল্টা চাষে সফলতা আসলে সাধারণ কৃষক ঝুঁকিমুক্ত চাষাবাদ ও আর্থিক ভাবে লাভবান হবেন।
অন্যদিকে কমে আসবে বিদেশী মাল্টা আমদানী। স্থানীয় ফল ব্যাবসায়ীরা বলছেন, ইতিমধ্যে ভালুকায় বিদেশী মাল্টা আমদানী প্রায় ৮০ ভাগ কমেগেছে। উপজেলা সদর, সিডষ্টোর বাজার, মাষ্টারবাড়ী, ভরাডোবা সহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখাগেছে আমদানীকৃত অল্পপরিমাণে মাল্টা দোকান গুলিতে শোভা বর্ধন করলেও স্থানীয় মাল্টাই বাজার দখলকরে আছে। বর্তমানে যে পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে এর ধারাবাহিকতা থাকলে অচিরেই ভালুকা উৎপাদিত মাল্টা এলাকার চাহিদা মিটিয়ে বাহিরে রপ্তানী করা যাবে। যেখানে আমদানী কৃত পাকিস্তানী মাল্টা বাজারে ৩শত টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, সেখানে স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত মাল্টা ৮০ থেকে ১ শত টাকা দরে কেজি বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় মাল্টাতে কোন ভেজাল নাই। অন্যদিকে আমদানী কৃত মাল্টাতে কেমিক্যাল ও ভেজাল থাকে। স্বাদেও রয়েছে পার্থক্য। আমদানী কৃত মাল্টা অনেকটা টক হলেও স্থানীয় মাল্টা মিষ্টি ও সু-স্বাদু। অনেকেই স্বপ্ন দেখছেন ভালুকার মাল্টা বিদেশে রপ্তানী করার।
উপজেলায় মাল্টার পাশাপাশি উন্নত জাতের লেবু ও কমলা চাষ হচ্ছে। কম পুঁজিতে মাল্টা চাষ করে অনেকেই সফল হয়েছেন। এমনি এক কৃষক উপজেলার ডাকাতিয়া ইউনিয়নের আঙ্গারগাড়া গ্রামের মৃত শামছুল হক মেম্বারের ছেলে রফিকুল ইসলাম নাননু। রফিকুল ইসলাম নাননু একাধারে একজন সফল কৃষক, গণমাধ্যম কর্মী ও লেখক। বড় ভাই অসর প্রাপ্ত মেজর শফিকুল ইসলামের উৎসাহে মাল্টা বাগান করার পরিকল্পনা করেন নাননু। পরে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে উদ্বুদ্ধ হোন বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষ করার।
এজন্য তিনি মাল্টা চাষের উপর ট্রেনিংও নিয়েছেন। ট্রেনিং শেষে বিনা মূল্যে ৪৫০টি চারাও পান। কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুুযায়ী সেই চারা ৬বিঘা জমিতে রোপন ও পরিচর্যা শুরু করেন। ইতোমধ্যে ৩ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেছেন। বাগানে যে পরিমান মাল্টা আছে তাতে আরো প্রায় ৩ লাখ টাকা বিক্রির আশাও তার। নাননু জানান, অন্য ফসলের চেয়ে মাল্টা চাষ অনেকটা নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত। মাল্টার পাশাপাশি তার বাগানে উন্নত জাতের পেঁয়ারা ও লেবু চাষ করে বাড়তি আয় হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসা সূত্রে জানাযায়, উপজেলায় ১৫৬ হেক্টর জমিতে ৬৫০টি মাল্টা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ৪২০টি বাগানে উৎপাদন শুরু হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২২৫০ মেট্রিক টন মাল্টা। যার বাজার মূল্য প্রায় ১৭ থেকে ১৮ কোটি টাকা। মাল্টার পাশাপাশি রয়েছে ফেন্সি জাতের লেবু। দার্জিলিং ও চায়না জাতের কমলা। মাল্টা বাগানেই লেবু চাষ হয়। এটাকে সাথী ফসল বলে। কেউ কেউ আলাদাও চাষ করেছেন। উপজেলায় ২৫৫ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ হয়েছে। ফলন এসেছে ২৪০ হেক্টর জমিতে ১০ হাজার ৮শত মেট্রিক টন। পাশাপাশি দার্জিলিং ও চায়না জাতের কমলা চাষও হচ্ছে। দার্জিলিং জাতের কমলার ফলনও সন্তোষ জনক হয়েছে। বাজারেও আসতে শুরু করেছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে চায়না জাতের কমলার ফলন আসতে শুরু করবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নুসরাত জামান জানান, ভালুকার মাটি ও আবহাওয়া মাল্টা, লেবু ও কমলা চাষের জন্য খুবই সহায়ক। ফলে এখানে মাল্টা, লেবু ও কমলা চাষে তিনি ব্যাপক সফলতা দেখছেন। তিনি জানান, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে মাল্টা, কমলা ও লেবু চাষিদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। চাষিদের চারা, স্পেয়ার মেশিন, গ্রাফটিং নাইফ, সিকেচার, সার ও কিটনাশক বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়। উপ-সহকারী কৃষি অফিসারগণ মাঠ পর্যায়ে চাষীদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
কৃষিবিদ নুসরাত জামান পরামর্শ দিয়ে বলেন, চাষীরা ইচ্ছে করলে মাল্টা চাষের পাশাপাশি সাথী ফসল, যেমন, লেবু, পেঁপে, শাক, সবজি লাউ, সিম চাষ করে বাড়তি আয় করতে পারেন। কৃষিবিদ নুসরাত জামান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চাষীরা উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত মূল্য পেলে আরো বেশি মাল্টা, কমলা ও লেবু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবে। তিনি স্বপ্ন দেখেন, ভালুকায় উৎপাদিত মাল্টা, লেবু ও কমলা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাহিরে রপ্তানী হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলীনূর খান বলেন, কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হওয়ায় মাল্টা চাষ উল্লেখ্যযোগ্য হারে বাড়ছে। স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত মাল্টা কেমিক্যাল ও ভেজাল মুক্ত, নিরাপদ, সুস্বাদু ও দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় হ বাজারে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ক্রয় করতে পারছে। উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে চাষিদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়োজনে প্রণোদনা দেওয়া হবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং এর মাধ্যমে কৃষকদের পন্যের ন্যায মূল্য নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, ভালুকার মাল্টা ও কমলা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাতে রপ্তানী করা যায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।