
চুয়াডাঙ্গায় কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ মোটাতাজা করে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হচ্ছেন মাছ চাষীরা। মাছ চাষীদের ভাগ্য বদলের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতি। সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে স্বল্প সময়ে তিনগুণ বেশী মাছ উৎপাদন হওয়ায় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হচ্ছেন শত শত পুকুর মালিক মাছ চাষী।
চুয়াডাঙ্গা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ছোট বড় ৯ হাজার ৩১২ জন মাছ চাষী রয়েছে। এ সকল চাষীরা প্রতিবছর ২৩ হাজার ৬২৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করে। জেলায় বাৎসরিক মাছের চাহিদা রয়েছে ২৭ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। জেলায় পুকুর রয়েছে ১১ হাজার ৫৮ টি। মৎস্যজীবীর সংখ্যা রয়েছে ৫ হাজারের ১১২ জন।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করছে ওয়েভ ফাউন্ডেশন। ২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ জেলায় মোট ১০৬টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ মোটাতাজাকরণ অব্যাহত রয়েছে। মাছ চাষের বিভিন্ন উপকরণ বিতরণের পাশাপাশি চাষীদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে ওয়েভ ফাউন্ডেশন। আর্থিক সহায়তাসহ পরামর্শ নিয়ে মাছ মোটাতাজাকরে অধিক মুনাফা আয় করে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকে মাছ চাষী।
এই পদ্ধতিতে পুকুরে নির্দিষ্ট পরিমাণে মাছের পোনা দেওয়া হয়। তবে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রামের কম ওজনের মাছ পুকুরে দেওয়া হয় না। এক বছর পর যথাযথ পরিচর্যায় বেড়ে ওঠে মাছ। এ পদ্ধতিতে অল্পদিনে বড় আকারের মাছ উৎপাদন করা যায়। এই পদ্ধতিতে পাতলা করে মাছ চাষ করতে হয় বলে প্রতি শতাংশে ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত পোনা ছাড়া হয়।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার পারকৃষ্ণপুর গ্রামের মাছ চাষী সুমন হালদার বলেন, তিনি দেড়শ’ বিঘা পুকুরে মাছ চাষ করেছেন। তার পুকুরে ছোট থেকে মাছ পরিচর্যা করে বড় করা হয়। তিনি কিছু কিছু বাছাই মাছ ৫০০ গ্রাম ওজনের ৪ বিঘা পুকুরে চাষ করেছেন। এ চাষে তার ব্যয় হবে ১০ লাখ টাকা। আর ৬ থেকে ৮ মাসে মাছ বিক্রি করে তিনি ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা আয় করতে পারবেন। তিনি বলেন, ৫০০ গ্রাম ওজনের মাছ প্রতি বিঘা পুকুরে ৩০০টি ছাড়তে হয়। ৪ বিঘা পুকুরে ১ হাজার ২০০টি মাছ ছাড়া হয়েছে। ৬ মাসে একেকটি মাছের গড় ওজন হবে ৪ কেজি। রুই ৩ কেজি, জাপানী রুইয়ের ওজন ৪ থেকে ৫ কেজি ও কাতলা মাছের ওজন হবে ৫ কেজি। বাজারে বিক্রি করলে প্রতিটি কাতলা মাছ ২ হাজার, প্রতিটি রুই মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০, জাপানী রুই প্রতিটি ১ হাজার ৫০০, ব্রিগেড মাছ ৮০০ থেকে ১ হাজার দাম পাওয়া যাবে। ছোট মাছের তুলনায় বড় মাছ লাভজনক বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, ২০ বছর মাছ চাষ করে তিন লাভজনক করতে পারেনি। কিন্তু এখন লাভের মুখ দেখছেন।
একই গ্রামের মাছ চাষী ইয়াকুব হোসেন বলেন,প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি মাছ চাষে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। তারও মাছ চাষের ইচ্ছা হচ্ছে। ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সহায়তা পেলে তিনিও মাছ চাষ করবেন।
ওই গ্রামের মাছ চাষী পলাশ হালদার বলেন, তিনি দুই বিঘা জমির পুকুরে ছোট মাছের চাষ করেছিলেন। ছোট মাছ চাষ করে ১ লাখ টাকার ওপরে লাভ হয়েছিলো। এখন তিনিও বড় মাছ পুকুরে ছেড়েছেন, ৬ মাস পরে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা লাভ হবে বলে তিনি জানান।
চুয়াডাঙ্গা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা সাঈদ-উর-রহমান জানান, পিকেএসএফের অর্থায়নে ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সহযোগীতায় তারা দামুড়হুদা উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তারা এখানে কার্প জাতের মাছ মোটাতাজাকরণ প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করেছেন। এ প্রদর্শনীর আওতায় চাষী পূর্বের তুলনায় বেশী মুনাফা অর্জন করছেন।
চুয়াডাঙ্গা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী কামরুজ্জামান যুদ্ধ বলেন, মাছ চাষীরা গতানুগতিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে আসছে। মাছ চাষ লাভজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়েভ ফাউন্ডেশন পিকেএসএফের সহায়তায় আধানিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করেছে। এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে চাষীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বি হচ্ছেন।
দামুড়হুদা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারুক মহলদার জানান, জনসাধারণের আর্থিক উন্নয়ন এবং আমিষের ঘাটতি পুরনের লক্ষ্যে মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দামুহুদা উপজেলায় ওয়েভ ফাউন্ডেশন মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম করছে। কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ আরো বাড়ানো গেলে এ এলাকার মাছ চাষীদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে, বেকারত্ব দুর হবে, আমিষের ঘাটতি পূরণ হবে এবং কিছু বৈদেশীক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
চুয়াডাঙ্গার ৪টি উপজেলায় মাছ চাষীদের প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে প্রযুক্তি নির্ভর মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটানোর ক্ষেত্রে অধিকতর ভুমিকা রাখার জন্য ওয়েভ ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন মাছ চাষীরা।