1. admin@bdtimes24.live : admin :
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১২ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা চাইলেন জামায়াত আমির সাইবার বুলিং ও অপতথ্য রুখতে তারেক রহমান সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ স্বপ্নের ফ্ল্যাটের প্রত্যয়ে স্বপ্ন শহর প্রোপার্টিজের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কানাডায় জমজমাট প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির অ্যালামনাই গেট-টুগেদার স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজের ৫৪তম বোর্ড বৈঠক অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের এএলএম কমিটির সভা অনুষ্ঠিত সাইবার আক্রমণ ঠেকানোর প্রশিক্ষণে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে বুটক্যাম্প সোনার বাংলা গড়ার নামে পরিবেশ বিপর্যয়: সাভারের কামালপুরে বন ও কৃষিজমি গিলে খাচ্ছে তথাকথিত রিসোর্ট বিএনপির ট্যাগ নিয়ে রুমিন ফারহানার ফেসবুক পোস্টে নতুন বার্তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত: ডেপুটি স্পিকার

তীব্র তাপপ্রদাহে চুয়াডাঙ্গা জেলার ৫টি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমান ১ হাজার ৪৪০ কোটি ৫০ লাখ ৪৮৪ টাকা

রিফাত রহমান, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
  • প্রকাশে সময় : মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০২৪
  • ১২৪ বার পঠিত
তীব্র তাপপ্রদাহে চুয়াডাঙ্গা জেলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমান ১ হাজার ৪৪০ কোটি ৫০ লাখ ৪৮৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ জেলার কৃষি, মৎস্য, প্রাণীসম্পদ, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার ওপর একটি সমীক্ষায় এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেরিয়ে এসেছে। চুয়াডাঙ্গা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের একটি গবেষক দল এ জেলায় সমীক্ষা চালিয়ে সেটা প্রকাশ করেছে।
ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মূখ্য গবেষক ড.মোহা.হাসান আলী জানান, এ ফাউন্ডেশন দীর্ঘ ৩৪ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, প্রাণীসম্পদ পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার উন্নয়নে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। চুয়াডাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় যে তীব্র তাপদাহ বয়ে গেছে তা উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলেছে এবং সেটা মোকাবেলায় কৌশল কি হতে পারে তার একটি তথ্যায়ন করার লক্ষে সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাপদাহের কবলে দুর্যোগে পড়া ৪টি জেলার ১০টি উপজেলায় এ সমীক্ষা নমুনায়নে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। চুয়াডাঙ্গা,
মেহেরপুর,ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলা। চুয়াডাঙ্গা সদর, দামুড়হুদা, জীবননগর, আলমডাঙ্গা, মেহেরপুর সদর ও  গাংনি উপজেলা, ঝিনাইদহ সদর ও মহেশপুর, কুষ্টিয়া সদর ও কুমারখালী উপজেলায় এ সমীক্ষা চালানো হয়। সমীক্ষায় তীব্র তাপদাহের কারন উল্লেখ করে বলা হয়,এ অঞ্চলে বিস্তৃত সমভূমি রয়েছে। এসব জেলা গুলোর পাশেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পৃথিবীর উষ্ণতম মুর্শিদাবাদ জেলা। এছাড়া বিহার ও উত্তর প্রদেশের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে সমভূমি। ভারতের এসব অঞ্চলে যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে তাপমাত্রা পরিবহন পদ্ধতিতে প্রবাহের মাধ্যমে বিনা বাধায় বাংলাদেশের এ অঞ্চলে ঢুকে পড়ে।
এ অঞ্চলের তাপমাত্রাও বেশী থাকে  ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা তাপমাত্রা এক হয়ে তীব্র তাপমাত্রা অনুভূত হয়। জলাশয়ের পরিমান কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা শোষণ হচ্ছেনা, যার ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাস্প এ অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে বলে বাতাসে জলীয়বাস্পের পরিমাণ অন্যান্য এলাকার তুলনায় এ এলাকায় বেশী থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে এপ্রিল মাসে বৃষ্টি না হওয়ায় এ অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুকুর-খাল-বিল ও জলাশয় অপরিকল্পিতভাবে ভরাট এবং দখলের কারনে তাপমাত্রাকে অসহনীয় করে তুলেছে।
এ অঞ্চল কর্কটক্রান্তি রেখার নিকটবর্তী হওয়ার কারনে তীব্র সূর্যকিরণ পড়ে। ব্যাপকহারে বৃক্ষনিধন ও কাঠপোড়ানো তাপদাহ পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলেছে। ছোট চুয়াডাঙ্গা জেলায় রয়েছে ৮৬টি ইটভাটা। এ ইটভাটা গুলোতে ১ লাখ ৩ হাজার ২০০ মেট্রিকটন কাঠপোড়ানো হয়। এ অঞ্চলে বালিমাটির প্রভাব বেশী । বালিমাটি খুব দ্রুত গরম ও ঠান্ডা হয়। তাছাড়া শহরায়নের ফলে সবুজায়ন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ফলে আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষি খাত:
তীব্র তাপদাহের কারনে গাছের পাতা কুঁকড়িয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কলা গাছ মরে এবং অপরিপক্ক কলার ছড়ি গাছ থেকে পড়ে গেছে। পান,পটল, লাউ, বেগুন,ঢেঁড়স, ঝিঙা, করলা চিচিংগাসহ অন্যান্য সব্জি পুষ্ট হওয়ার আগেই হলুদ হয়ে যায়। শাক্ জাতীয় ফসল রোদে পুড়ে নষ্ট হয়েছে। একাধিকবার শাক্ ও সব্জি নতুন করে বুনতে হয়েছিল। পোকার আক্রমণসহ বিভিন্ন রোগ বালাই দেখা দেয়। গরমে ঔষধের মান ঠিক ছিলনা। ফসলের পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে যায়। পেঁপে,মাল্টা, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের চারা মরে যাওয়ায় বেশীভাগ জমিতে দু’তিনবার চারা লাগাতে হয়েছিল। আম,কমলা ও মাল্টার গুটি ঝরে এবং ড্রাগন ফলের ফুল পচে যায়। তীব্র তাপদাহের কারনে অপুষ্ট ধান পেকে চিটা হয়ে গিয়েছিল। ভুট্টার ফলনও কম হয়েছে।
পান গাছের মাথা শুকিয়ে ও পাতা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে পরিচর্যা ব্যয় বাড়লেও  উৎপাদন কম হয়েছে। বিভিন্ন গাছের ফুল নষ্ট হওয়ায়,ফল ধরলেও আম, কাঁঠাল ও লিচুর আকার তুলনামূলকভাবে ছোট হয়েছে। ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই তা পেকে এবং বাদাম,কচু, চালকুমড়া সব্জি মারা গেছে। তাপদাহে বৃষ্টি না হওয়ায় বোরো ধানে বাড়তি সেচ দিতে হয়েছে। এতে বিঘা প্রতি গড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ধানের দানা পুষ্ট না হওয়ায় ও সময়ের আগেই পেকে যাওয়ার ফলে চলতি মৌসুমে বোরো ধান বিঘা প্রতি ২ মন ফলন কম হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলায় এ মৌসুমে বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৬ মেট্রিকটন। কিন্তু উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪২৩ মেট্রিকটন।
উৎপাদন কম হয়েছে ২১ হাজার ৩৪৬ মেট্রিকটন। ভুট্টার মোচায় দানার সংখ্যা কম ও অপুষ্ট হওয়ায় এ মৌসুমে ভুট্টার ফলন বিঘা প্রতি ৬ মন কম হয়েছে। চলতি মৌসুমে এ জেলায় ৪৯ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৮২ হাজার ৬৩৫ মেট্রিকটন। কিন্তু উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৫৯৬ মেট্রিকটন। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৯ হাজার ৩৯ মেট্রিকটন কম। ড্রাগন ফল প্রতি বিঘায় ৫০০ কেজি উৎপাদন কম হয়েছে। জেলায় ১ হাজার ৯৯৫ বিঘা জমিতে ৮ হাজার ১০ মেট্রিকটন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ড্রাগন ফল উৎপাদন কম হয়েছে ৯৯৮ মেট্রিকটন। মাল্টা ও কমলা বাগানে প্রায় ৭০ শতাংশ ছোট গুটি ফল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কারনে এবার ৫০ শতাংশ উৎপাদন কম হওয়ার ফলে মাল্টা ও কমলা চাষে বিঘাপ্রতি প্রায় ২ হাজার কেজি উৎপাদন কম হয়েছে। তীব্র তাপদাহের কারনে খামারী শ্রমিকরা দিন ব্যাপী মাঠে কাজ করতে পারেনি। দিনে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা কাজ করলেও তাপদাহে ৪ থেকে ৫ ঘন্টার বেশী কাজ করতে পারেনি। তাপদাহের ফলে কৃষিপণ্য মাঠ থেকে সংগ্রহ করে বাজারে নিয়ে আসতে গিয়ে শুকিয়ে এবং দাগী হয়ে গিয়েছিল। সে কারনে বাজারে কৃষিপণ্যের দাম কম পেয়েছে কৃষকরা।
পানির অভাবে পুঁইশাকের পাতা হলুদ হয়ে যাওয়ায় বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় কম হয়েছে। ঢেঁড়স, করলা, ঝিঙেসহ অন্যান্য সব্জি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কম হয়েছে এবং পরিচর্যা ব্যয় বৃদ্ধি পায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। পান গাছের মাথা শুকিয়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ক্ষতি হবে। পটল ক্ষেতে প্রতি বিঘা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় কম হবে। শুধুমাত্র চুয়াডাঙ্গা জেলায় এ মৌসুমে ৩৫ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি ৭০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে ধানের দানা পুষ্ট না হওয়ায়  এবং সময়ের আগেই পেকে যাওয়ার ফলে বিঘা প্রতি ২ মন ফলন কম হওয়ার দরুণ গড়ে ২ হাজার টাকা আয় কমেছে।
এর ফলে উৎপাদন কম হওয়ায় আয় কম হবে ৫৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা। এ কারনে বোরো মৌসুমে মোট ক্ষতি হয়েছে ১২০ কোটি ৭ লাখ ২৭ হাজার ৮০০ টাকা। ভুট্টার মোচায় দানার সংখ্যা কম ও অপুষ্ট হওয়ায় বিঘাপ্রতি ৬ মন ভুট্টা উৎপাদন কম হয়েছে। জেলায় মোট ৮৯ হাজার ৩৯ মেট্রিকটন উৎপাদন কম হওয়ায় কৃষকদের ২২২ কোটি ৫৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আয় কম হয়েছে। জেলা ১ হাজার ৯৯৫ বিঘা জমিতে ৮ হাজার ১০ মেট্রিকটন ড্রাগন ফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থাকলেও উৎপাদন কমে হয়েছে ৯৯৮ মেট্রিকটনে। যার ফলে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
তীব্র তাপদাহে চুয়াডাঙ্গা কৃষি খাতে ক্ষতির বিষয়টি সমীক্ষায় সেটা প্রকাশ করা হয়েছে সেটা মানতে নারাজ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তেরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা। তিনি বলেন, এ খাতে ক্ষতির পরিমান তেমন নয়। যে ক্ষতি হয়েছে সেটা পুষিয়ে দেয়ার জন্য কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। বোরো ধানের ফলন বিপর্যয় হয়নি। বরং এ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া শাক্ সব্জি ফলমূল ফলনে তেমন প্রভাব পড়েনি।
ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্য খাত:
চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোট জলাশয় রয়েছে ৬ হাজার ৫৯৪ হেক্টর। পুকুরের সংখ্যা ১০ হাজার ৫৯৩টি, বাওড়ের সংখ্যা ১০টি, নদীর সংখ্যা ৫টি ও বিলের সংখ্যা ৬১টি। এ জেলায় মৎস্যজীবী ৫ হাজার ১১২ ও মৎস্য চাষী রয়েছে ৯ হাজার ৩১৩ জন। কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৪ হাজার ৩৫৬ জন। মৎস্যজীবী সমিতির সংখ্যা ৪৪টি। বার্ষিক মাছ উৎপাদন ২৩ হাজার ৭৩০ ও মাছের চাহিদা ২৫ হাজার ২৪৫ এবং মাছের ঘাটতি ১ হাজার ৫১৫ মেট্রিকটন।
তীব্র তাপদাহে অধিকাংশ খাল, বিল ও পুকুর শুকিয়ে যাওয়ার ফলে মাছের গড়ন পর্যাপ্ত হওয়ার আগেই মাছ তুলে ফেলার কারনে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পুকুরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তীব্র তাপদাহের কারনে মাছ এবং মৎস্য সম্পদের জন্য প্রয়োজনীয় পানির পরিমান ও গুনগত মান পরিবর্তন হওয়ায় মাছের বাড়ন্ত কমে গেছে,এতে লোকসানের মুখে পড়েছে মাছ চাষীরা। একজন মাছ চাষী গত বছরে ৫ লাখ টাকা লাভ করলেও এবার ৪ লাখ টাকার মাছ বেচতে পেরেছে। গরমের কারনে মাছের মোড়ক থেকে বাঁচার জন্য অসময়ে তড়িঘড়ি করে মাছ বিক্রি করে ফেলার কারনে মাছ চাষীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে মাছের প্রজনন ও উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাছ চাষীরা সঠিক সময়ে ডিম ফোটাতে পারেনি।
ফলে মাছ চাষ দেরীতে হচ্ছে। তাপদাহের কারনে পানি অতিরিক্ত গরম হওয়ায় রেণু পোনার মৃত্যু হার বেড়েছে। রেণু পোনা উৎপাদন ৫০ শতাংশ নেমে এসেছে এবং জলাশয় পানির অভাবে ৫০ শতাংশ শুকিয়ে গেছে। মৎস্যজীবীদের আয় কমে গেছে। তারা স্বাভাবিক অবস্থায় যেখানে সপ্তাহে ৪-৫ দিন কাজ করতো,তাপপ্রদাহের কারনে ১-২ দিনের বেশী কাজ পায়নি। একদিনে যেখানে মৎস্যজীবীরা ৫০০ টাকা আয় করতো ,সেখানে সপ্তাহে তাদের আয় হয়েছে ৮০০ টাকা। তাপদাহের কারনে তড়িঘড়ি করে সব মাছ ধরে বিক্রি করার ফলে বাজারে মাছের আমদানী বেশী হয়, সে কারনে চাষীরা  কম দামে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।  এতে চাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ শতাংশের অধিক মাছ উৎপাদন কমে যাবে। এতে শুধু চুয়াডাঙ্গা জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার ৪৯০ মেট্রিকটন কম মাছ উৎপাদন হয়েছে। যার মূল্য প্রায় ৯৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
তীব্র তাপদাহের কারনে মৎস্য খাতে ক্ষতি প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল বলেন, তাপপ্রবাহে মৎস্য উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ কারনে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কিছুটা ব্যাহত হবে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও মাছ চাষীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে মাছ চাষ কিভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বৃষ্টিপাত এ বছর দেরীতে আসছে। বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ চাষীদের পোনা ও মাছ উৎপাদনের জন্য কারিগরি সহায়তা দেবো। আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে মাছ উৎপাদনে সহায়তা করবো।
ক্ষতিগ্রস্থ প্রাণীসম্পদ খাত:
প্রচন্ড তাপপ্রদাহের কারনে গো-খাদ্যের সমস্যা ছিল। অধিকাংশ গরুর গোয়াল বা থাকার জায়গা টিন দিয়ে তৈরী এবং চারদিকে ঘেরা। বিধায় আলো বাতাস চলাচলের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় রোগবালাই বেড়ে গিয়েছিল। গবাদি পশুর অন্যতম খাদ্য ঘাস মারা এবং ঘাসের বৃদ্ধি কমে যাওয়ায় পশু খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাপদাহ থেকে ঘাস তাজা রাখতে গিয়ে ঘাসের জমিতে অধিক সময় সেচ দিতে হয়েছে। ফলে ঘাস উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। গরমের কারনে পারিবারিক পর্যায়ে ছোট খামারীগণ খোলা জায়গায় গরু-ছাগল চরাতে পারেনি। এ কারনে প্রাণী খাদ্য বেশী পরিমান কিনতে হয়েছে। যার কারনে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মোট লাভ কম হয়েছে।
তীব্র তাপদাহের মাস এপ্রিলে চুয়াডাঙ্গা জেলাতে শুধুমাত্র দুধ উৎপাদন ১ হাজার ৮৩৮ মেট্রিকটন কম হয়েছে। এ কারনে খামারীদের ১১ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। শুধুমাত্র চুয়াডাঙ্গা জেলায় এপ্রিল মাসে মাংস উৎপাদন কমে গেছে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ২২৫ মেট্রিকটন। এ মাসে ডিম উৎপাদন কমেছে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ ৪৫ লাখ। দৈনিক হাজিরায় শ্রমিকরা অনেকেই প্রচন্ড গরমে কাজ করতে চায়নি। যারা কাজ করতে চেয়েছে তারা কম শ্রমে বেশী মজুরী দাবী করেছে। তীব্র তাপপ্রদাহে খামারীদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে এবং মোট মুনাফা কম হয়েছে। গাভী পালনকারী খামারীদের অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। বিধায় সেখানে দুধ সংরক্ষেণের কোন ব্যবস্থা নেই। পক্ষান্তরে তীব্র তাপদাহের  কারনে বাজারে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় কিছু খামারী গাভী পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
গরু মোটাতাজাকরণে সময় বেশী লাগছে। প্রতিপালন ব্যয় বেড়েছে কিন্তু সময়ের তুলনায় ওজন বাড়েনি। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে গরু পালনকারীরা। তীব্র তাপপ্রদাহে কারনে গরুর দুধ দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে। দুধ উৎপাদন কম ছিল। গরমে ডিমের দামও তুলনা মূলক কম ছিল। ফলে খামারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থের মুখে পড়ে। মাংস উৎপাদন কম হওয়ায় চুয়াডাঙ্গা জেলার খামারীদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮১ কোটি ৭০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ডিম উৎপাদন কম হওয়ায় খামারীদের আর্থিক ক্ষতির পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
এ সময় সব প্রাণীই খাবার কম খাওয়ার কারনে বিগত সময়ের তুলনায় ওজন কম বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাগল, ভেড়া ও গাভীর একটি অংশ যথাসময়ে প্রজনন উপযোগী হয়নি। একটা অংশে ‘হিট মিস’ হয়েছে এবং কিছু সংখ্যক প্রাণীর গর্ভপাতও ঘটেছে। সর্বোপরি চুয়াডাঙ্গা জেলায় তীব্র তাপপ্রদাহের কারনে প্রাণীসম্পদ খাতে খামারীদের ৯৬ কোটি ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
তীব্র তাপদাহের কারনে ক্ষতি প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের উপ-পরিচালক  আ.হা.ম.শামিমুজ্জামান বলেন, তীব্র তাপদাহের কারনে এ খাতে যাতে ক্ষতি না হয় সে কারনে জেলা এবং উপজেলা প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খামারীদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কৃষকরা ক্ষতিরোধ করার ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ কাজে লগিয়েছে। তবে যে হয়নি তা নয়। আমাদের পরামর্শ মেনে চলতে গিয়ে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। পোল্ট্রি খাতে ক্ষতি পরিমান বেশী ছিল। সেটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালচ্ছি আমরা।
ক্ষতিগ্রস্থ পরিবেশ খাত:
তীব্র তাপদাহের সঙ্গে বৃষ্টি না হওয়ায় খরা দেখা দেয়ায় কৃষকের ফসলে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ পর্যায়ে ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সেচ, শ্রমিক ও কীটনাশক ব্যয় বেড়ে গেছে। ধানের ওপর প্রভাব না পড়লেও তীব্র তাপদাহের কারনে এ অঞ্চলের কৃষকরা পাট বপন করতে পারছেনা। আম,লিচু, পেয়ারার গুটি ব্যাপকভাবে ঝরে গেছে। তীব্র তাপে করলা, শশা, কচুসহ বিভিন্ন ধরনের সব্জির গোড়া ও আগা শুকিয়ে এবং ফুল ও ফল ঝরে গেছে। অতি খরা, অতি উচ্চ তাপমাত্রার কারনে ফসলের উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তীব্র তাপমাত্রার কারনে পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ভু-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাওয়ায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ গ্রামে টিউবওয়েলে পানি উঠছেনা। অর্ধেকের বেশী নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে। গ্লোবাল ফরেস্ট  ওয়াচের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১০ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১২৫ হেক্টর জমিতে বনভুমি ছিল। ২০২৩ সালে ১ হেক্টরের বেশী বনভুমি গাছ হারা হয়ে যায়। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ তাদের ডিজিটাল এলার্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সতর্কতা রিপোর্ট দেয় যে,তীব্র তাপদাহে ২৮ এপ্রিল থেকে ৫ মে মধ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ৭৬টি বন উজাড় হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্থ জীবন-জীবিকা খাত:
টানা তীব্র তাপদাহের কারনে চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের রাস্তা-ঘাটে লোকজন কম বের হয়েছে। বেশীভাগ দোকানপাট বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। মানুষের স্বভাবিক চলাচল ব্যহত  হয়েছে এবং ব্যবসা-বানিজ্য ও উৎপাদনশীলতায় এক ধরনের ধ্বংস নেমে এসেছিল। তাপদাহে রাস্তার পিচ গলে গিয়ে পথচারী চলাচল এবং রাস্তায় ভারীযানবাহন নষ্ট হয়ে চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। তীব্র তাপে শ্রমিক,কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, রিক্সা-ভ্যান চালকরা কাজ করতে না পেরে তাদের দৈনিন্দন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। তাদের আয় রোজগারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। কর্মঘন্টা কমে যাওয়ায় তাদের আয় অর্ধেকে নেমে আসে। আগে দিনমজুরী করে ৪০০ টাকা আয় হতো,সেটা ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় নেমে আসে। ভ্যান ও ইজিবাইকে অত্যাধিক তাপের কারনে যাত্রী পাওয়া যায়নি,ফলে এখানে আয় কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়ার কারনে নিত্যপণ্যের চাহিদাও কমে যায়। সে কারনে বেচাকেনা কমে যাওয়ায় সেখানে আয় কমেছে ৩০ শতাংশ। দিনের বেলা ঘরের বাইরে থাকা কষ্ট সাধ্য হয়ে উঠেছিল,এ জন্য নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ায় তাদের ৩০ শতাংশ আয় গিয়েছিল। তাপদাহের কারনে সকল পেশার মানুষের কর্মঘন্টার পরিবর্তন হয়। কৃষি শ্রমিকরা দিনে ৫ ঘন্টার বেশী কাজ করতে পারেনি,যা আগে ৮-৯ ঘন্টা করে করতো। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেলা ১২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার কারনে ৬ ঘন্টা সময় নষ্ট হয়েছে। তাপদাহের কারনে এলাকায় সামাজিক রীতি-নীতি ,আচার-অনুষ্ঠান, ধর্ম-কর্ম পালনে ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন, বিয়ে, খৎনাসহ অনেক অনুষ্ঠানের নির্ধারিত তারিখ অনেকে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। অনেক বিয়ের তারিখ পরিবর্তনের ফলে বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজে যথা সময়ে ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
   সমীক্ষায় ক্রমবর্ধমান তাপপ্রদাহে ৫টি খাতে অংশ নেয়া মানুষের মূল্যায়নের নিরিখে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি নিরূপণ করা হয়। সেই সঙ্গে প্রত্যেকটি খাতে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সঙ্গে কথা বলে,ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য কি কি করণীয় তা সুপারিশ আকারে উপস্থাপন করা হয়।
Facebook Comments Box

এই জাতীয় আরও খবর