
দিন যায় কথা থাকে। বিদায়ী বছর ২০২৪ রেখে যাচ্ছে অনেক স্মৃতি। কোনোটি সাফল্যের আবার কোনোটি ব্যর্থতার। ব্যতিক্রমী আয়োজন, অর্জন এবং ব্যক্তিজীবন নিয়েও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিলেন অনেকে। ঘটন-অঘটন, উত্থান-পতন ও ছন্দ পতনের বছরে এই গ্রহের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটনায় ঘনঘটা নিয়ে ২৪-এর চালচিত্র।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৭ জানুয়ারি ২০২৪। বিরোধী দলগুলোর বয়কটের মুখে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার নির্বাচনে জয়লাভ করে। ৭ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পেয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পায়। জাতীয় পার্টি ও বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী এ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে। ৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয় এবং অবশেষে ১০ জানুয়ারি জয়ী সাংসদরা শপথ গ্রহণ করেন।

স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে ঘটেছে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। গত ২৫ ডিসেম্বর বুধবার গভীর রাতে সাত নম্বর ভবনের ছয় থেকে নয়তলা পর্যন্ত চারটি ফ্লোরে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১০ ঘণ্টা চেষ্টার পর ফায়ার সর্ভিসের ১৯টি ইউনিট আগুন নির্বাপণ করে। এ সময়ে ভস্মীভূত হয়েছে এলজিআরডিসহ ৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আসবাবপত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নথি। আগুন নেভানোর কাজে গিয়ে ট্রাকচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ২টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নজিরবিহীন এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হতে পারে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্তের আগে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। অগ্নিকাণ্ডের সময় পুরো সচিবালয় এলাকা কালো ও ঘন ধোঁয়ায় ডেকে যায়। আগুনের ঘটনায় বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ব্যাহত হয়েছে সচিবালয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা পর আগুন পুরোপুরি নিভেছে। ছড়িয়ে পড়া আগুনের চারটি ফ্লোরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রায় সবকিছুই ছাই হয়ে গেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন
কোটা সংস্কার আন্দোলন বা জুলাই আগস্ট আন্দোলন অথবা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সব থেকে বেশি আলোচিত বিষয়। ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারি করা পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পর কোটা পদ্ধতির সংস্কার আন্দোলন আবার নতুনভাবে আলোচনায় আসে। শুরুতে আন্দোলন সভা-সমাবেশের মধ্যে স্থির থাকলেও ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এক বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের পরোক্ষভাবে ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর পর থেকেই কোটা আন্দোলন আরও জোরদার হয়। এ আন্দোলনে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী (প্রায় ২১ হাজার) আহত হওয়ার পাশাপাশি আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধসহ প্রায় ১০০০ জনের অধিক নিহত হন।
তরুণ ছাত্র সমাজের হাত ধরে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ফের একবার জাগ্রত হলো বাংলাদেশ। ৫২, ৬৯ ও ৭১-এর পর ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটিয়েছিল মূলত এদেশের ছাত্রসমাজ। দীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালে আরেকটি অভ্যুত্থান দেখল বাংলাদেশ। এবারও ছিল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। আন্দোলনের তীব্রতার মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা।
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে টানা চতুর্থবারের মতো নতুন সরকারের ক্ষমতা নেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতার পরও ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমাধান করতে পারেনি হাসিনা সরকার। একের পর এক বিতর্কিত বক্তব্য ও ভুল সিদ্ধান্তের ফলে ক্রমেই বেড়েছে আন্দোলনের তীব্রতা। যা সামাল দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করেছেন শেখ হাসিনা। গত ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার আগে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রেকর্ড করার অনুমতি চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেয়া হয়নি। এদিন দুপুর আড়াইটার দিকে গণভবন থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ‘নিরাপদ স্থানের উদ্দেশ্যে’ পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
এ সময় সঙ্গে ছিলেন ছোটবোন শেখ রেহানা। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষিপ্ত জনতা শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করেন এবং যে যেমনে পেরেছেন লুট করে নিয়ে গেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দলোনে শেখ হাসিনা সরকারের করুণ পতন হবে এমন ধারণা সরকারের কেউই করতে পারেনি। সরকারের এমন আÍবিশ্বাস ছিলো, তাদের প্রবল দাপটে যেকোনো আন্দোলন খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। সরকার পতনের যেকোনো আওয়াজকে তারা চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম। গত ১৫ বছর ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিলো যে সেটাকে উপড়ে ফেলা বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। সাধারণ মানুষ হয়তো কল্পনা করতো যে শেখ হাসিনার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর কিছু পরিবর্তন আসলেও আসতে পারে। কিন্তু কে জানতো একটা টর্নেডো এসে হাসিনা সরকারকে তছনছ করে দেবে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগ
৫ আগস্ট তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বাসভবনে প্রবেশ করে আন্দোলনকারীরা। এ সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
অন্তর্বর্তী সরকার
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টাসহ এ সরকারের সদস্যসংখ্যা ২১। উপদেষ্টামণ্ডলীতে রয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার দুজন বিশেষ সহকারী, একজন আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত আছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় ঋণ
বেপরোয়া গতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় ঋণ নিয়ে অধিকাংশ সময়ে দেশ পরিচালনা করেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে যে কোনো সরকারের চেয়ে আওয়ামী লীগ সরকারই অতিমাত্রায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ঋণের জন্য নির্ভরশীল ছিল। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরে ক্ষমতাচ্যুত সরকার ১ লাখ ৩২ হাজার ২২৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এসব ছাপানো টাকাও লুটপাট করার অভিযোগ আছে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে। এর বিপরীতে উৎপাদন বাড়েনি। ফলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে, যা বিশেষ করে স্বল্প-আয়ের মানুষকে নিষ্পেষিত করেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সেনাপ্রধান
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ জামান জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। শিগগিরই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। নাগরিকদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বানও জানান তিনি। সেনাপ্রধান জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, সম্প্রতি সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করব আমরা। দেশে আর কোনো কারফিউ বা জরুরি অবস্থার প্রয়োজন নেই। ৪ আগস্ট রাতেই একটি সমাধান বের করার প্রতিশ্র“তি দেন তিনি।
কোটা আন্দোলন শুরু এবং চাওয়া
কোটা সংস্কারের প্রথম দফা আন্দোলনে ২০১৮ সালের ১৩ মার্চের মধ্যে দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য একটি আলটিমেটাম দেওয়া হয়। তারপর আবার ৯ এপ্রিল কয়েক হাজার সমর্থক কর্মী গণপদযাত্রা করে বেলা ৩টায় শাহবাগে এসে জমা হন। কিন্তু সেদিন সরকারি বাহিনী ওই জমায়েতকে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে আন্দোলন থেমে না গিয়ে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কিছুতেই যখন এই আন্দোলন থামানো যাচ্ছিল না, তখন ১১ এপ্রিল সংসদে সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্ভবত এটি ‘আবেগপ্রসূত’ বা ‘বিরক্তিবশত’ একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি নিজেও পরে স্বীকার করেছেন বিষয়টি। জাতীয় সংসদে সব রকম কোটা বাতিলের ঘোষণার পর ২০১৮ সালের অক্টোবরে যে নির্বাহী পরিপত্র জারি করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা হাইকোর্টে একটি রিট করেন।
হাইকোর্ট ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর এই কোটা পরিবর্তনের পরিপত্রটিকে বাতিল করে দেন। ফলে সব ধরনের কোটা আবার পুনর্জীবিত হওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। এই আপিল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি হওয়ার প্রথম তারিখ ঠিক হয় গত ৪ জুলাই। কিন্তু ক্রমান্বয়ে ছাত্রদের আন্দোলন বাড়তে থাকলে গত ২৩ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে রায় দিতে বাধ্য হন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগ বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে সরকারের পরিপত্র বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া ‘বিতর্কিত’ রায় বাতিল করেন। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে ৭ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রাখার নির্দেশনা দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য এক শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য এক শতাংশ কোটা রাখতে বলেছেন সর্বোচ্চ আদালত।
বিতর্কিত বক্তব্যই কাল হলো শেখ হাসিনার
গত ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, কোটা বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। মামলার পর আদালত যে রায় দেন, এতে নির্বাহী বিভাগের কিছু করার নেই। আদালতেই সমাধান হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?
জার্মানি সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই ১৪ জুলাই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের স্লোগান ওঠে, ‘আমি কে? তুমি কে? রাজাকার রাজাকার’। পরে তা বদলে হয় ‘চেয়েছিলাম অধিকার/ হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘আমি কে? তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার/ কে বলেছে? কে বলেছে? সরকার, সরকার’। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের বদলে ‘স্বৈরাচার’ শব্দটিও শোনা গেছে। এরপর এই আন্দোলন আর দমানো যায়নি। সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজধানীর সব সড়ক অবরোধ করে প্রতিদিনই আন্দোলন করেন। আন্দোলন পরবর্তীতে এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যা আর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
কাদেরের বক্তব্য উসকে দেয় সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকে
গত ৪ জুলাই আদালত যখন শুনানি আরও এক মাস পেছান তখন ছাত্রদের আন্দোলন আরও তীব্রতর হতে থাকে। অবশেষে ৬ জুলাই কোটাবিরোধীরা সারা দেশে ‘বাংলা বন্ধের’ ডাক দেন। সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, পরীক্ষা বর্জন ও সাধারণ ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান জানান। গত ১১ জুলাই ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটাবিরোধীরা সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে যে শক্তি প্রদর্শন করছেন, তা বেআইনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা লিমিট ক্রস করে যাচ্ছেন। সারা দেশব্যাপী জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে কোটা আন্দোলন করতে দেওয়া প্রশাসনিক দুর্বলতা কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, এটা প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, আমরা ধৈর্য ধরছি। ধৈর্য ধরা মানে দুর্বলতা নয়। আমরা জোড় করে আন্দোলনের ওপর চড়াও হব, তখন আপনি কি বলবেন? সময়মতো সব কিছুই দেখবেন, সময়মতো যথাযথ অ্যাকশন নেয়া হবে। সেসময় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের রাজাকার স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগই দেবে বলে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ছাত্র আন্দোলনের কতিপয় নেতা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটার জবাব ছাত্রলীগই দেবে। ছাত্রদের বিষয় ক্যাম্পাস পর্যন্ত সীমিত থাকবে। আমরা দেখি রাজনৈতিকভাবে কারা প্রকাশ্যে আসে, তখন দেখা যাবে। আমরাও মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পরই গত ১৬ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
এরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের সামনে প্রথমে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে দফায় দফায় ক্যাম্পাসজুড়ে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী একজোট হয়ে ফের আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র, রড ও লাঠিসোটা হাতে থাকা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর দখলে চলে যায় ক্যাম্পাস। সংঘর্ষের সময় কয়েকজন যুবককে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা গেছে। সন্ধ্যায় বহিরাগতদের ক্যাম্পাস থেকে বের করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানে পুলিশ প্রবেশ করে। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর মধ্যরাতে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে পুলিশ।
ছাত্রলীগ পদধারী অনেকের পদত্যাগ
আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এর প্রতিবাদে ছাত্রলীগের পদধারী অনেক নেতা পদত্যাগ করেন। এর বাইরে অনেক কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন।
ডিবি প্রধান হারুনের কাণ্ড
গত ১ আগস্টে ডিবি হেফাজতে নেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগে গত ২৮ জুলাই (রোববার) বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুন অর রশীদ জানান, ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ তাদের আটক করা হয়েছে। গত ২৭, ২৮ ও ২৯ জুলাই নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও নুসরাত তাবাসসুমকে হেফাজতে নেয় ডিবি। ডিবি কার্যালয় থেকে সমন্বয়কদের জোড় করে বিবৃতি দিতেও বাধ্য করেন হারুন। যা ছাড়া পেয়ে গণমাধ্যমকে জানান সমন্বয়করা।
সাফাই গেয়েছিলেন আইনমন্ত্রী
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক গত পহেলা আগস্ট (বৃহস্পতিবার) বলেন, তারা (সমন্বয়ককারীরা) আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে জিডিও করা হয়েছিল। এখন তারা বলছেন তাদের আর নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই। যখন তারা চলে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, চলে যেতে আমরা কোনো বাধা দেইনি। তারা চলে গেছেন। সমন্বয়কদের ডিবি অফিসে নেওয়ার বিষয়ে করা মামলা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী জানান, ৬ সমন্বয়ককে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়েছে নিরাপত্তার জন্য। সেটাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট ডিভিশনে একটা মামলা করা হয়েছিল। একজন বিচারপতি অসুস্থতার কারণে ছুটিতে থাকায় শুনানি হচ্ছে না।
রাজপথে তারকারা
শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোনের সূত্র ধরে শুরু হওয়া হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ ও একদফা দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন তারকারা। আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, প্রিন্স মাহমুদ, মোশাররফ করিম, সিয়াম আহমেদসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই ছিলেন আন্দোলনের অগ্রভাগে।
ড. ইউনূসের কারাদণ্ড
২০২৪-এর ১ জানুয়ারি নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস দেশের শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের অন্য তিনজনের প্রত্যেককে ঢাকার শ্রম আদালত ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন এবং পরবর্তীতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার শর্তে ১ মাসের জামিন দেন।
বেইলি রোডে রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ড
ঢাকার বেইলি রোডের একটি বহুতল ভবনে আগুন লেগে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া আরও ৭৫ জন বিভিন্নভাবে আহত অবস্থায় উদ্ধার হন। গ্রিন কোজি নামক বহুতল ভবনে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্র“য়ারি রাতে এই অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। ভবনটিতে একাধিক রেস্তোরাঁ ও দোকান ছিল, যার মধ্যে কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁ, স্যামসাংয়ের শো-রুম, গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার, ইল্লিয়িন, খানা’স ও পিৎজা ইন উল্লেখযোগ্য।
এমভি আব্দুল্লাহ ছিনতাই
২০২৪ সালের ১২ মার্চ এমভি আব্দুল্লাহ নামের একটি জাহাজ ছিনতাই করে সোমালিয়ান জলদস্যুরা। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজে ২৩ জন বাংলাদেশি নাবিক ছিলেন যাদের জিম্মি করেছিল সোমলিয়ান জলদস্যুরা। ১৫ এপ্রিল, ২০২৪ সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাত থেকে ছাড়া পায় এমভি আব্দুল্লাহ।
ফোর্বস ‘৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ এশিয়া’তে ৯ বাংলাদেশি
১৬ মে ফোর্বস ম্যাগাজিনের ফোর্বস ‘৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ এশিয়া’-তে স্থান পান নয় বাংলাদেশি। এই তালিকায় এশিয়ার ৩০ বছরের নিচের ৩০০ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এতে জায়গা করে নিয়েছেন ৯ বাংলাদেশি, যাদের কেউ তরুণ উদ্যোক্তা, সাংবাদিক, নেতা ও আবিষ্কারক।
এমপি আনোয়ারুল আজিম নিখোঁজ
২২ মে ভারতের কলকাতায় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের লাশ উদ্ধার হয়। ভারতে চিকিৎসার উদ্দেশে গিয়ে তিনি ১৩ মে থেকে নিখোঁজ ছিলেন। এই ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০ মে পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২২ মে সকালে কলকাতার নিউটাউনে অভিজাত আবাসন সঞ্জীবা গার্ডেন থেকে তার শরীরের কিছু অংশ উদ্ধার হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, ১৩ মে নিউটাউনের সেই বাড়িটিতেই তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
ঘূর্ণিঝড় রেমাল
ঘূর্ণিঝড় রেমাল ২৬ মে সন্ধ্যা থেকে ২৭ মে সকাল নাগাদ বাংলাদেশে আঘাত হানে। এ ঘূর্ণিঝড়ে ৭ জনের মৃত্যু হয়।
সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের পুকুরচুরি
সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের ২৪তম মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন । ২০২৪ সালের এপ্রিলে দুটি গণমাধ্যমে ‘বেনজিরের ঘরে আলাদিনের চেরাগ’ এবং ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর আলোচনায় আসেন বেনজীর আহমেদ। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন আহমেদের সম্পদের তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। দুর্নীতি দমন কমিশন বলছে, বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সূত্র ধরে বেনজির আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ১২ জুন আদালত বেনজির আহমেদ ও তার পরিবারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন।
মতিউর রহমানের ছাগলকাণ্ড
কোরবানির ঈদের সময় ১২ লাখ টাকায় ঢাকার মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ইফাত নামের এক তরুণের ছাগল কেনার ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে আলোচনায় আসেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মতিউর রহমান। সরকারি এক কর্মকর্তার ছেলে কোরবানির জন্য ১২ লাখ টাকায় ছাগল কেনেন এই খবরে শোরগোল পড়ে সারা দেশে। নেটিজেনরা মতিউর রহমানের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এবং এই ঘটনার জের ধরেই মতিউর রহমানকে পদচ্যুত করা হয়।
পাহাড়ধসে নিহত ৯ জন
ভারী বর্ষণে এ বছরের ৯ জুন কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহার ধসে ৮ জন রোহিঙ্গাসহ ৯ জন নিহত হন। এ ঘটনায় সাত রোহিঙ্গাসহ নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন স্থানীয় বাসিন্দাও ছিলেন বলে জানিয়েছেন শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।
তোফাজ্জল হোসেনকে গণপিটুনিতে হত্যা
ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালে ছয়টি মোবাইল চুরির অভিযোগ এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তোফাজ্জল হোসেনকে আটক করে। তাকে ফজলুল হক মুসলিম হলে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ছাত্রলীগের তিনজন নেতা এবং দুই সক্রিয় সদস্যসহ ছাত্ররা তাকে ক্রিকেট ব্যাট ও স্ট্যাম্প ব্যবহার করে আহত করে। এ সময়ে তাকে ক্রিকেট ব্যাট ও স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত করা হয়। কিছুক্ষণ পর তোফাজ্জলকে হলের ক্যানটিন থেকে খাবার সরবরাহ করা হয়, কিন্তু তার খাওয়া শেষ করার পরপরই এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ের গেস্টরুমে নিয়ে সহিংসতা চালানো হয়। শিক্ষার্থীরা হোসেনের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দাবি করে। একটি প্রক্টর দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও হোসেনের তাৎক্ষণিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। হোসেনের অবস্থার অবনতি হলে তাকে প্রক্টরদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যারা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে পৌঁছালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
চিš§য় কৃষ্ণ দাশ ও ইসকন প্রসঙ্গ
২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বরে চিš§য়কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে। জাতীয় পতাকার উপরে গেরুয়া পতাকা উত্তোলনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। পরদিন ২৬ নভেম্বর তাকে চট্টগ্রাম ষষ্ঠ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়, যেখানে ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরিফুল ইসলাম তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রামে চিš§য় কৃষ্ণ দাশ-এর রিমান্ড শুনানিকে কেন্দ্র করে তার সমর্থকেরা আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে হত্যা করে।
এশিয়া কাপ শিরোপা জয়
ভারতকে ফাইনালে হারিয়ে গত ৮ ডিসেম্বর এসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ শিরোপা জেতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল।
ইকোনমিস্টের চোখে বছরের সেরা দেশ ‘বাংলাদেশ’
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ বেশ কয়েকবার ‘বিশ্বের ১ নম্বর দেশ’ হিসেবে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু সেসবের প্রায় সবই দুর্নীতি বা দুর্যোগের জন্য। এবার ব্রিটিশ সাপ্তাহিক দ্য ইকোনমিস্টের বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে প্রোগ্রেস বা অগ্রগতির জন্য। কেন, কীভাবে? সেসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে আসুন আমরা একবার বুকভরে শ্বাস নিই এবং গর্বের সঙ্গে বলি, বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ছাড়া ‘ফাইনালিস্ট’ হিসেবে যে দুটি দেশকে তারা বিবেচনায় রাখে, সেগুলো হলো সিরিয়া ও পোল্যান্ড। বাংলাদেশের মানুষ জয়লাভ করেছে এমন এক জগদ্দল, অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যার অপসারণ ৫ আগস্টের কয়েক সপ্তাহ আগেও অসম্ভব মনে হয়েছিল। অসম্ভবকে পরাস্ত করতে চাই সাহস, মৃত্যুকে অস্বীকার করার মতো অবদমিত মনোবল। এই সাহসী, অপরাজেয় বাংলাদেশকে যে সেরা দেশ নির্বাচিত করা হবে, তাতে বিস্ময়ের কী আছে!
বিচারবহির্ভূত হত্যার
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে বিচার ছাড়াই ১৯২৬ জনকে হত্যা করা হয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অলিউল্লাহ মোল্লা ২০১৬ সালের ১০ জুলাই পুলিশের ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন। তাঁর পরিবার বলছে, ওই দিন বিকেলে অলিউল্লাহকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়েছিল পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী। পরদিন সকালে অলিউল্লাহর মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
পুলিশ তখন দাবি করেছিল, ঘটনার দিন রাত সাড়ে তিনটার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় টহলরত পুলিশ অলিউল্লাহকে থামার সংকেত দেয়। তিনি না থেমে উল্টো পুলিশের দিকে বোমা ও গুলি ছোড়েন। তখন পুলিশের পাল্টা গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে পুলিশের নথিতে এ ঘটনাকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ উল্লেখ করে অলিউল্লাহর পরিচয় লেখা হয় ‘সন্ত্রাসী’। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে এমন ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ারের’ নামে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার এই হিসাব বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক)। তারা এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে।
র্যাবকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
বাংলাদেশে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং সংস্থাটির ছয়জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ম্যাগনিৎস্কি আইনের অধীনে এটি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা।
মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন
৫ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় আমেরিকায়। শুরুতে ৮২ বছরের জো বাইডেনকে প্রার্থী হিসেব বেছে নিয়েছিল ডেমোক্র্যাট। কিন্তু পরে ভোটের লড়াই থেকে সরে যান বাইডেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে শামিল হন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হতে দেখা যায় কমলাকে অনেকটা পিছনে ফেলে দিয়েছেন বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচন জিতে দুরন্ত প্রত্যাবর্তন ঘটান তিনি।
বাশার আল আসাদের পতন
২৭ নভেম্বর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ভয়ংকর রূপ নেয়। আল কায়দার শাখা সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নেতৃত্বে আলেপ্পো দখল করে নেওয়ার ঘোষণা করে বিদ্রোহীরা। তারপর একে দারা, হোমসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করার পর ৮ ডিসেম্বর রাজধানী দামাস্কাসে পৌঁছয় বিদ্রোহীরা। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে তারা। পতন ঘটে আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের শাসনের।
রাশিয়ায় নির্বাচন
১৭ মার্চ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় রাশিয়ায়। ফলপ্রকাশের পর দেখা যায় ভাদিমির পুতিনের ঝুলিতে রয়েছে ৮৭.৮ শতাংশ ভোট। ফলে বিপুল জনসমর্থন পেয়ে ফের একবার রাশিয়ার মসনদে বসেন পুতিন। টানা পঞ্চমবার প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন তিনি। ইউক্রেন যুদ্ধ, বিরোধী নেতা নাভালনির মৃত্যু কোনও কিছুই প্রভাব ফেলেনি নির্বাচনে। ১৯৯৯ সাল থেকে রাশিয়ার মসনদে রয়েছেন পুতিন। এবারেও রেকর্ড ভোটে জিতে ২০৩০ পর্যন্ত ক্ষমতায় রাশ ধরে রাখলেন তিনি। এই মেয়াদ যদি শেষ করতে পারেন তাহলে রাশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রেসিডেন্ট থাকার নজির গড়বেন পুতিন। টপকে যাবেন জোসেফ স্ট্যালিনকেও।
ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যু
১৯ মে কপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। জানা যায়, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আরস নদীর উপরে একটি বাঁধ উদ্বোধন করার কথা ছিল রাইসির। সেই কর্মসূচিই ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনে। একটি পার্বত্য অঞ্চল পেরিয়ে যাওয়ার সময় কপ্টারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তর-পশ্চিম ইরানের একটি পাহাড়ে আছড়ে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় ইসরায়েলের দিকে ষড়যন্ত্রের আঙুল ওঠে। কিন্তু সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দেয় তেল আবিব।
ইরানে নির্বাচন
ইব্রাহিম রাইসির আকস্মিক মৃত্যুর পর নির্বাচন হয় ইরানে। ৬ জুলাই নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সংস্কারপন্থি নেতা মাসুদ পেজেস্কিয়ান। জোর টক্কর দিয়ে তিনি পরাজিত করেন কট্টরপন্থি নেতা সাইদ জালিলিকে। পেজেস্কিয়ানের শপথগ্রহণে গিয়েই গুপ্তঘাতকের হাতে তেহরানে মৃত্যু হয় হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়েহর। এই খুনে অভিযোগের আঙুল ওঠে ইসরায়েলের দিকে।
ঋষি সুনাকের পরাজয়
৫ জুলাই ব্রিটেনের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়। নজির গড়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন কেয়ার স্টারমার। তার দল লেবার পার্টির কাছে ভরাডুবি হয় কনজারভেটিভ পার্টির। প্রধানমন্ত্রীর গদি হারান ঋষি সুনাক। ১৪ বছর পর টোরি শাসনের অবসান ঘটে রাজার দেশে।
পাকিস্তানে নির্বাচন
লাগাতার নাশকতার মধ্যেই ৮ ফেব্র“য়ারি পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। জেলে বসেই আমজনতার জন্য বিশেষ বার্তা দেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ভোটের ফল গণনার পর দেখা যায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, শাহবাজ শরিফের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)। সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পান ইমরানের দল পিটিআই সমর্থিত নির্দলরা। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকার কারণে তারা সরকার গঠন করতে পারেননি। ফলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন শেহবাজ শরিফ।
এডিসি হারুন ও এডিসি সানজিদার কাণ্ড
এডিসি হারুন ৯ সেপ্টেম্বর রাতে এক নারীর সঙ্গে বারডেম হাসপাতালে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেসময় ওই নারীর স্বামী কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই নেতাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান এবং তাদের দুজনকে একসঙ্গে পান। সেখানে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে এডিসি হারুনের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। পরে পুলিশ ফোর্স নিয়ে এসে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে বেদম মারধর করেন এডিসি হারুন অর রশিদ। এডিসি সানজিদা বলেন, হঠাৎ আমার বুকে ব্যথা হয় তারপর আমি এডিসি হারুন স্যারকে বলে বারডেম হাসপাতালে এক ডাক্তারের সিরিয়াল নেই। সেই ডাক্তার আসতে দেরি করায় আমি হারুন স্যারের সাথে হাসপাতালে একটু সময় কাটাই তখন আমার স্বামী গুণ্ডাপাণ্ডা এনে হারুন স্যারকে প্রচুর মারধর করে এবং আমাদের দুজনের অন্তরঙ্গ ভিডিও করার চেষ্টা করে, আমার হারুন স্যার একদম নির্দোষ, আমার স্বামী রাষ্ট্রপতির এপিএস আজিজুল দোষী। এরপরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এডিসি সানজিদা ও এডিসি হারুনের পরকীয়া সম্পর্কের কথা ছড়িয়ে পড়ে। তবে সানজিদা বলেন, ‘উনি (হারুন) আমার সিনিয়র কলিগ। এর বাইরে আর কোনো বিষয় নেই। এই ঘটনার পর স্বামীর সঙ্গে আমার আর কোনো কথা হয়নি।
ডিবি হারুনের ভাতের হোটেল
দুই বছর ডিবি প্রধান হিসেবে দায়িত্বপালন করতে গিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা, সেলিব্রেটি ও ছাত্রনেতাদেরকে নিজ অফিসে নিয়ে ভাত খাইয়েছেন হারুন অর রশীদ। আবার সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশও করেছেন। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচিত সমালোচিতও ছিলেন তিনি। অনেকে রসিকতার ছলে ডিবি অফিসের সেই ডাইনিং রুমকে ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি একটি সুপরিচিত নামও ছিল। যদিও এসব মন্তব্যকে ইতিবাচক হিসেবেই নিতেন হারুন।
ভাতের হোটেল নামটি প্রথম আলোচনায় আসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে ভাত খাওয়ানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করার পর। গত বছর ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে খাবার খান গয়েশ্বর। হাসিমুখে ডিবি প্রধানের সঙ্গে তার খাবার খাওয়ার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়। এতে দেখা যায়, হারুন অর রশীদ নিজে গয়েশ্বরের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
জানা যায়, ওইদিন খাবারের মেন্যুতে ছিল খাসির মাংস, মুরগির মাংস, একাধিক মাছের তরকারি, রোস্ট ও সবজি। এছাড়া আম, মালটা, আঙ্গুর ও ড্রাগন ফলও ছিল খাবারের টেবিলে। মধ্যাহ্নভোজ শেষে ডিবির একটি সাদা গাড়িতে করে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে তার বাসায় পৌঁছে দেন ডিবি সদস্যরা।
আয়নাঘর
শেখ হাসিনার পতনের পর ‘আয়নাঘর’ আবার আলোচনায় উঠে এসেছে। সেখান থেকে ইতোপূর্বে তিনজন বন্দি মুক্তি পেয়েছেন। গত দুই দিন রাজধানীর কচুক্ষেতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হওয়া মানুষের খোঁজে ভিড় জমাচ্ছেন স্বজনরা। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাউন্টার-টেররিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) দ্বারা পরিচালিত একটি গোপন আটক কেন্দ্রের নাম আয়নাঘর। ধারণা করা হয়, এখানে কমপক্ষে ১৬টি কক্ষ রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে ৩০ বন্দি রাখার সক্ষমতা রয়েছে। আয়নাঘরটি বাংলাদেশের ঢাকা সেনানিবাস এলাকায় অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়।
সুইডেনভিত্তিক স্বাধীন নিউজ পোর্টাল নেত্র নিউজের একটি অনুসন্ধানী হুইসেলব্লোয়ার প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে অভিযোগ করা হয় যে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা আয়নাঘরে (আয়নাঘর) বলপূর্বক গুমের শিকারদের আটক ও নির্যাতন করছে। সুইডেন ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল গোপন কারাগারের সম্ভাব্য অবস্থানও প্রকাশ করেছে, যেখানে বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের বাংলাদেশে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয় আয়নাঘর আসলে গোয়েন্দাদের একটি গোপন বন্দিশালা বা ডিটেনশন ক্যাম্প।
আয়নাঘরে যারা বন্দি থেকেছেন তাদের মধ্যে রয়েছে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ মোবাশার হাসান, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান, ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায়। এছাড়াও আয়নাঘর থেকে সম্প্রতি ছাড়া পেয়েছেন বাংলাদেশি ব্যারিস্টার এবং জামায়াতে ইসলামী নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমদ বিন কাসেম, সাবেক সামরিক জেনারেল এবং জামায়াতে ইসলামী নেতা গোলাম আযমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আজমি, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগঠন ইউপিডিএফের মুখপাত্র মাইকেল চাকমা।
বাংলাদেশের জনগণ শান্তি চায়। আর এই শান্তির জন্য যা যা করা প্রয়োজন ড. ইউনূস সরকার সেটা করবে বলে জাতি বিশ্বাস করতে চায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে ইউনূস সরকারের পেছনে। তাই সরকার এই বৃহৎ শক্তিকে ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত করে সংস্কার করতে পারবে বলে আশা করি।
বিস্তারিত লিখেছেন- আহসান হাবিব