
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির জাদুম্পর্শে দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের চিত্র। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মূলত প্রযুক্তির বিপ্লব। ইতিমধ্যেই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন সফলভাবে বাস্তবায়নের পর স্মার্ট বাংলাদেশ-২০৪১ বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যার লক্ষ্য হচ্ছে একটি সাশ্রয়ী টেকসই, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানভিত্তিক স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ।
আশা করা যায় পরিকল্পিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রযুক্তির এ জোয়ারে বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। আরও আশার কথা যে বিশিষ্টজনেরা এবং গবেষকেরা বলছেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল শক্তি হবে নারী। যেখানে শারীরিক সামর্থ্যের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের দরকার পড়বে বেশি। নৃতাত্ত্বিক গবেষণা, ইতিহাস ও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নারীর অবস্থান প্রমাণ করে যে উপযুক্ত পরিবেশের প্রেক্ষিতে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সৃজনশীল কাজ, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা,ধৈর্য, মানবিকতায়, মেধায় নারীরা এগিয়ে। এসব বিবেচনায় উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে প্রযুক্তি বিপ্লবের এ জয়যাত্রায় সামিল হতে পারে হাওরের পিছিয়ে পড়া নারীরাও।
বাংলাদেশের সব সেক্টরে উন্নয়নের সাথে সাথে একসময়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পশ্চাৎপদ হাওরেও হয়েছে লক্ষণীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। বিশেষ করে কৃষিতে। যে কৃষির সাফল্যের জন্যই বাংলাদেশের অর্থনীতি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকে সে কৃষিতে হাওর অঞ্চলের কৃষকেরা গর্বিত অংশীদার। সেই উন্নয়নের অংশীদার হাওরের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীরাও। শীতের রাতে আইল্যার পাশে বসে সেও পুরুষের সঙ্গে মৌসুমের চাষাবাদের পরিকল্পনা করে। চাষাবাদের মহাযজ্ঞ সমাপনের প্রয়োজনে নারী পুরুষ একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। কৃষক মাঠে যায়, কৃষাণী বাড়ি সামলায়, রান্না বাড়া করে, সন্তান লালন পালনের সাথে সাথে গবাদিপশু, হাঁস মুরগি লালন পালন করে, বাড়ির আশে পাশে শাক সবজি ফলানো, জ্বালানির জন্য ঘুঁটে দেয়া, খড় শুকায়। ধান বাড়িতে আনার পর বাকি কাজ প্রধানভাবে নারীদের ওপর বর্তায়। স্থান কাল সম্প্রদায় ভেদে নারীরাও কৃষিক্ষেতে রোয়া লাগানো, ধান কাটাসহ অন্যান্য কাজ করে। বান বন্যায় কষ্টের বোরো ধান যখন তলিয়ে যেতে থাকে তখন স্বামী পুত্রের সঙ্গে কন্যশিশু ও নারীরাও ক্ষেতে নামে। ভাসতে ভাসতে ডুবে, ডুবতে ডুবতে পানির তল থেকে সোনালি স্বপ্ন তোলে আনে। আগাম বন্যায় ভেসে যাওয়া ধানক্ষেতে নয়ন ভাগার সময় পুরুষ কৃষকের সঙ্গে নারী কৃষকেরও পাঁজরের হাড় ভাঙা কান্নায় বাতাস ভারি হয়।
হাওরের দরিদ্র নারীরা শ্রমিক হিসাবেও বাড়িতে ও ক্ষেতে খলায়, হাঁসের খামারে, মাছের খামারে, গরুর বাথানে কাজ করে। মৌসুমে ধানের খলায় পড়ে থাকে দিন রাত। পুরুষ প্রধান পরিবার যেমন আছে তেমনি আছে নারীপ্রধান। বর্ষা মৌসুমে হাওরে জেলেরা মাছ ধরে জেলেনিরা মাছ সংরক্ষণ করে, শুঁটকি বানায়। এই হাওরের প্রান্তিক নারীই সংসারের হাল ধরার প্রয়োজনে শহরের গার্মেন্টস বা অন্য কোথাও শ্রম বিক্রি করতে যায়।
এমনি বহু কাজের সঙ্গে জড়িত থাকে হাওরের সকল শ্রেণির নারীরা। এভাবেই হাওরের পরিশ্রমী নারীরা দিন রাত খেটে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তবু নেই তাদের কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি। তাদের কৃষি কার্ড না থাকায় সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা যেমন ভর্তুকি, কৃষি ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান, মহাজনদের থেকে হাওরের নারীরা উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয় সংসারের প্রয়োজনে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসছে পুরুষপ্রধান পরিবারে সে ঋণের টাকাও নারী উদ্যোক্তারা তাদের ইচ্ছেমতো বিনিয়োগ করতে পারে না। হাওরে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক নারীদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত, নাম মাত্র পড়াশোনা জানা। তারা সাধরণত ব্যাংকে লেনদেন করতে অনভ্যস্ত। তারা সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি যেগুলো আয় বাড়িয়ে নারীকে স্বাবলম্বী করে সেসব প্রশিক্ষণের আওতা থেকেও বঞ্চিত হয়।
বিভিন্ন কারণেই নারীদের সম্পদ ও সম্পত্তির পরিমাণ খুবই নগণ্য, প্রান্তিক হাওরের নারীরা আরও নিঃস্ব। ফলে ঋণের শর্ত, প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল ছিন্ন করে সাধারণভাবে হাওরের প্রান্তিক নারীরা উদ্যোক্তা হিসাবে সরকারি সুবিধা নিতে পারেন না। যদিও সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সুদের হার কমসহ অন্যান্য সুবিধা বরাদ্দ করেছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে নারীদের পক্ষে দাবি আছে -বিনা সুদে, বিনা শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদানের। গৃহস্থালি করা কাজের মূল্য নির্ধারণ, স্বীকৃতিরও দাবি উঠছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে।
৮ মার্চ নারী দিবসের বাণীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন-“বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীদের এগিয়ে নেয়ার জন্য এবং ২০৪১ সালের উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিভিন্ন উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ ও আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার পাশাপাশি মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে টেকসই জীবিকায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। নারী যেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে এ লক্ষ্যে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমসহ তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। গৃহকর্মে নারীর শ্রম ও অবদানকে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, জয়িতা ফাউন্ডেশন, হাইটেক পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ, আর্নিং এন্ড লার্নিং, শি পাওয়ার বা প্রযুক্তির সহায়তায় নারীর ক্ষমতায়ন প্রকল্প। উল্লেখিত এমন বহু প্রচেষ্টাগুলোর সাথে হাওরের দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীরা সম্পৃক্ত হতে পারে না তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা, আর্থিক অসচ্ছলতা, অবস্থানগত প্রতিবন্ধকতা ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে যুক্ত হলেও খুবই নগণ্য সংখ্যক। বর্তমানে STEM শিক্ষা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। STEM ও প্রযুক্তি শিক্ষা নারীকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদানকারী জনগোষ্ঠী হিসাবে গড়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু শুধু হাওরেই না, গ্রামের স্কুলগুলোতে এখন মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছেলে শিক্ষার্থীর সমান বা বেশি হলেও সকল শিক্ষার্থীরাই বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষায় পিছিয়ে। স্কুল কলেজে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়া ছাত্র/ছাত্রী কম। সেক্ষেত্রে STEM এডুকেশনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে হাওরে। শুধু তাই না, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলা, স্মার্ট বালাদেশ বিনির্মাণ, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নারী পুরুষের সমতা অর্জন, সকল শ্রেণির নারীদের ক্ষমতায়ন, স্মার্ট দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে হাওর অঞ্চলের নারীদের বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হবে। এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উপায় বের করতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, হাওর অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক এই সব কঠোর পরিশ্রমী নারীরা যদি প্রযুক্তিগত এ উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হতে পারে পারে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পিছিয়ে পড়া অদক্ষ জনগোষ্ঠী হিসাবে কর্মহীন হয়ে পড়বে। তাই দক্ষ, অদক্ষ, পিছিয়ে পড়া, অগ্রসর, অনগ্রসর সকলকে নিয়ে, সকলকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুত করেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রথম ও দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে নারী কৃষি অর্থনীতির তাৎপর্যহীন শ্রমদাসীর জীবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে কলকারখানায়, যুক্ত হয়েছে উৎপাদনে। তাতে নারী যেমন মুক্তির স্বাদ পেয়েছে তেমনি শিল্পের অন্তহীন মুনাফা ও শোষণে দাবানলের মতো জ্বলে উঠে শ্রমজীবী নারী। সে সময় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীরাও দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, রাজনৈতিক অধিকার অর্জন, ভোটাধিকার অর্জন, ৮ মার্চ নারী দিবসসহ বহু অধিকার অর্জনের মাইলফলক ছিল আঠারো উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লব। তৃতীয় শিল্প বিপ্লব ইন্টারনেট আবিষ্কারও নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানকে বিকশিত করার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবেও নারী অবলা, অস্থির, ন্যাকা দুর্বল, পুরুষের পাঁজরের হাড়, অর্ধাঙ্গিনী এসব বাণীগুলোকে মিথ্যা সারহীন প্রমাণ করে মুক্তির পথে নারী এগিয়ে যাবে বহদূর।