একটি শিশু যখন মাদরাসায় প্রবেশ করে তখন তার সঙ্গে শুধু একটি বইয়ের ব্যাগ ঢোকে না; ঢোকে তার পরিবারের প্রত্যশা। একজন বাবা সন্তানকে ওস্তাদের হাতে তুলে দিয়ে ভাবেন, এখানে সে কুরআন, হাদিস, আদব শিখবে, ভালো মানুষ হবে। মা বিশ্বাস করেন, যে সন্তানকে এতদিন বুকের মধ্যে আগলে রেখেছেন, মাদরাসার দেয়ালের ভেতরেও সে নিরাপদ থাকবে। এই বিশ্বাসের মূল্য টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
অথচ সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই যদি কোনো শিক্ষক শিশুর প্রতি নির্যাতনের হাত বাড়ায়, কোনো মাদরসার পরিচালক অপরাধ জেনেও উপেক্ষা করে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষার মানের চেয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাবকে বড় করে দেখে, তাহলে সেটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ থাকে না; সেটি একটি আমানতের খেয়ানতে পরিণত হয়।
সম্প্রতি বিভিন্ন প্রাইভেট (কওমি) ও মহিলা মাদরাসাকে ঘিরে বলাৎকার, শিশু নির্যাতন, অমানবিক শারীরিক শাস্তি, পর্দার অবহেলা এবং শিক্ষকদের নৈতিক বিচ্যুতির নানা অভিযোগ আমাদের সামনে এসেছে। অভিযোগের সবকিছু সত্য এমন অন্ধ সিদ্ধান্ত যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি মাদরাসার নাম এসেছে বলেই সবকিছুকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়াও আত্মপ্রবঞ্চনা। সত্য-মিথ্যা যাচাই করে সত্য প্রমাণিত হলে অপরাধীর পরিচয়, পোশাক কিংবা ধর্মীয় পদমর্যাদা বিবেচনা না করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
সংকটটা কোথায়? প্রশ্ন হলো, কীভাবে একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটার সুযোগ তৈরি হয়? এগুলো আসলে কোন প্রতিষ্ঠান? কে বা কাদের দ্বারা এসকল ঘটনা ঘটছে? বর্তমানে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অলিগলিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসংখ্য প্রাইভেট মাদরাসা গড়ে উঠেছে। বছরের শুরুতে পোস্টার-ব্যানারে আকর্ষণীয় প্রচারণায় বলা হয় এখানে আদর্শ মানুষ তৈরি করা হবে। কিন্তু সেই আদর্শ মানুষ তৈরির কারিগরদের যোগ্যতা যাচাই হয় কতটুকু? তাদের চরিত্র যাচাই, পূর্বের কর্মস্থলের তথ্য নেওয়া, শিশুদের সঙ্গে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয় কি?
দুঃখজনক বাস্তবতা এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের পরিচালনায় নেই যথাযথ অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, সুষ্ঠু শিক্ষা পদ্ধতি কিংবা জবাবদিহি। মূলত, অনেকে দীর্ঘদিন মাদরাসায় আরবি পড়াশোনা করায় কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জন হয় না। পরে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে পড়ায় হঠাৎ মাদরাসা খুলে বসেন। শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে কম বেতনে কাজ করতে রাজি হওয়াটাই যেন বড় যোগ্যতা। আবাসিক মাদরাসার শিক্ষক শুধু একজন কর্মী নন। দিনের পর দিন তিনি শিশুর কাছাকাছি থাকেন। বাবা-মায়ের চেয়েও বেশি সময় তার সঙ্গে কাটে। ফলে শিক্ষক নির্বাচন ভুল হলে ক্ষতি কেবল একটি ক্লাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; একটি শিশুর শৈশব, মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে।
দীর্ঘদিন আবাসিক প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষকের এমন অনিয়ন্ত্রিত অবস্থান থেকেই কিছু ক্ষেত্রে বলাৎকার ও শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্টই বলতে পারি-কিছু নামধারী আলেমের অসতর্ক পরিচালনা ও অযোগ্য শিক্ষকের কারণে বাস্তবেই কয়েকটি মাদরাসায় এসব অপরাধ ঘটছে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন অপরাধের দায় পুরো কওমি মাদরাসা ব্যবস্থা বা হক্কানি ওলামায়ে কেরামের ওপর চাপানোও অন্যায়। বড় কওমি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা, উস্তাদদের পাঠদান এবং ছাত্রদের সঙ্গে আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাই প্রয়োজন অপরাধ ঢেকে রাখা নয়; বরং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা । শুধু ধর্মীয় পরিচয় বা কোনো পরিচিত আলেমের সুপারিশের ওপর ভরসা করে একজন মানুষকে শিশুদের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া এটি আস্থা নয়; দায়িত্বহীনতা।
কোনো শিক্ষক যদি সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে একটি শিশুর শরীর, সম্মান কিংবা শৈশবকে ধ্বংস করে দেয়, তাহলে তার অপরাধের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠবে সেই নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে। আলেমের পরিচয় কিংবা মাদরাসার শিক্ষকতা কোনোটিই একজন মানুষকে অপরাধের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না। বরং যে ব্যক্তি ধর্মের শিক্ষক হিসেবে মানুষের সামনে দাঁড়ান, তার নৈতিক পতন আরও ভয়াবহ। কারণ সে শুধু একজন মানুষের ক্ষতি করে না; ধর্মীয় আস্থার ওপরও আঘাত করে। কোনো উস্তাদ অপরাধ করলে তাকে ‘হুজুর’ বলে আড়াল করা দ্বীনের সেবা নয়। কোনো মাদরাসা পরিচালক অপরাধীকে রক্ষা করলে সেটি প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষা নয়। আর কোনো নির্যাতিত শিশুর কান্নাকে ‘মাদরাসার বদনাম হবে’ বলে চেপে রাখা হলে সেটি নিছক নীরবতা নয় অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো। একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের সম্মানের চেয়ে একটি শিশুর নিরাপত্তা বড়। এই সত্যটি যত দ্রুত মেনে নেওয়া যাবে মাদরাসা তত দ্রুত নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে।
মহিলা মাদরাসার সংকট আরও সংবেদনশীল: মহিলা মাদরাসার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের প্রত্যাশা আরও বেশি। তারা মেয়েকে শুধু পড়াশোনার জন্য পাঠান না; পর্দা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় পরিবেশের আশায় পাঠান। তাই সেখানে সামান্য অবহেলাও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। পুরুষ শিক্ষক, পরিচালক বা কর্মচারীদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ, নির্জনতা, ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহারের পথ খোলা রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পর্দা শুধু পোশাকের নাম নয়; এটি একটি নিরাপদ পরিবেশেরও দাবি। আর নারী-সংক্রান্ত কোনো অনৈতিকতার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি যত বড় আলেমই হোন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্মীয় পদমর্যাদা কোনো অপরাধের লাইসেন্স নয়।
আবাসিক ব্যবস্থার অদৃশ্য ঝুঁকি: আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি শিশু দিনের পর দিন পরিবারের চোখের আড়ালে থাকে। ফলে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। কে কখন ছাত্রদের সঙ্গে একা থাকবে রাতে নজরদারি কীভাবে হবে, মনখুলে কার নিকট সবকিছু নির্ভয়ে জানাতে পারবে, কোনো ছাত্র আচমকা ভীত বা অস্বাভাবিক হয়ে গেলে কে খেয়াল করবে, অভিযোগ জানালে কার কাছে যাবে এসবের সুস্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। শুধু তালা-চাবি দিয়ে আবাসিক প্রতিষ্ঠান নিরাপদ হয় না। নিরাপত্তা তৈরি হয় নিয়ম, পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
খেদমতের নামে অমানবিক শ্রমশোষণ: কিছুদিন পূর্বে আমি এক মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে ইন্টারভিউ দেই। যথাযথ যাচাইয়ের পর সিলেক্টেড হলে আমার বেতন নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৬ হাজার টাকা। অথচ আমার কোন মাসিক বা সপ্তাহিক ছুটি নেই। প্রত্যহ কর্মসময় ২৪ ঘন্টা। কি অমানবিক বেতন নির্ধারণ তাদের! অথচ আমি পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে মাসিক বেতনের এই অঙক হাস্যকর। তাৎক্ষণিক সাংবাদিকতার পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ হওয়ায় আমি সে খেদমতটি প্রত্যাখ্যান করি। সারা বাংলাদেশে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নমুনা এরূপ। বলা যায় কিছু শিক্ষকের অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়।
অনুপযুক্ত কর্ম পরিবেশ, পারিবারিক ও মানবীয় সকল চাহিদা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সবকিছু বিসর্জণ দিয়ে দীর্ঘ দিন বন্দি জীবনে থাকতে হয় তাকে । কেউ আলেম হলেই ফেরেশতার ন্যায় তার মাঝে শারীরিক চাহিদা মিটে যায় না। তাই শিক্ষকদের জীবনধারনোপযোগী বেতন ও পরিবারের সাথে বসবাসের সুযোগ বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার। খেদমতের নামে তাদের মানবিক অধিকার বঞ্চিত করা অব্যহত রাখলে অচিরেই আরও ভয়াবহ ফলাফল ভুগতে হবে। উপরন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের কর্তব্য হচ্ছে ছাত্রকে শাষণ করার সময় প্রহার পরিত্যাগ করে ভালোবাসার সহিত কোমল শাষণ করা যেন তার মাঝে পড়ালেখা বা উস্তাদের প্রতি আতংক তৈরী না হয়।
মাদরাসার বাণিজ্যিকীকরণও বন্ধ করতে হবে: ধর্মীয় শিক্ষাদানের মাধ্যমে উপার্জন আপত্তিকর কিছু নয়। কিন্তু শিক্ষা যখন সেবার জায়গা হারিয়ে কেবল আয়ের মডেলে পরিণত হয়, তখন বিপদ শুরু হয়। ছাত্রসংখ্যা, মাসে কত টাকা উঠল, কত বেতন বাকি, খরচ কমানো গেল এসব যদি শিক্ষার মান, ছাত্রের নিরাপত্তা ও শিক্ষকের যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে মহিলা মাদরাসার নামে অভিভাবকদের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে যদি কেউ ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, সেটি শুধু অনৈতিক নয়; ধর্মীয় বিশ্বাসেরও অপব্যবহার।
অবিলম্বে এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা করা জরুরী। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই ন্যায়বোধ থাকা দরকার। কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা প্রতিষ্ঠান দখলের উদ্দেশ্যেও মিথ্যা অভিযোগ উঠতে পারে। তাই অভিযোগের তদন্ত প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়েও অপরাধ হয়। মাদরাসার কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে অপরাধের কারখানা হিসেবে দেখানোও সত্যের বিকৃতি। অপরাধীকে খুঁজে প্রমাণ থাকলে বিচার করুন। কিন্তু ভিউ ও উত্তেজনার জন্য একটি পোশাক, একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি পুরো শিক্ষা ধারাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না।
এখন দরকার আত্মসমালোচনা, আত্মপ্রবঞ্চনা নয়: একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সমস্যাকে অস্বীকার না করে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার অনুমোদন ও পরিচালনার জন্য কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা , শিক্ষক নিয়োগে জীবনবৃত্তান্ত, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, চরিত্র ও আচরণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন ব্যবস্থা, কোনো অপরাধীকে শুধু প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির কথা বলে রক্ষা না করা, কোনো শিক্ষক গুরুতর অপরাধে দোষী প্রমাণিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হলে তিনি যেন পরিচয় গোপন করে অন্য মাদরাসায় গিয়ে আবার শিশুদের দায়িত্ব না পান সে ব্যবস্থা করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী মাদরাসা থেকে বের হয়ে যেন উচ্চ শিক্ষার জন্য জেনারেল প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করতে পারে সিলেবাসকে সাধারণ শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো অত্যন্ত জরুরী। আজ কওমি মাদরাসার সামনে তাই প্রশ্ন-
আমরা কি শুধু বাইরের সমালোচনার জবাব দেব, নাকি নিজেদের ভেতরের পচনও নির্মম হাতে পরিষ্কার করব? দেয়ালে যত সুন্দর আয়াতই লেখা থাকুক, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অন্যায় থাকলে সেই দেয়াল মানুষকে বাঁচাতে পারে না। তাই এখন সময় সাফাই গাওয়ার নয়-সময় সত্য বলার, ভুল স্বীকার করার, অপরাধ দমন এবং কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করার।