জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে শুরু হয়েছে বিশ্বনেতাদের ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি। এরই অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে নিউইয়র্কের লোটে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে বিশ্বনেতাদের সম্মানে এ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীরা এতে অংশ নেন।
এর আগে একই দিন সকালে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া প্রাতরাশেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে এই প্রাতরাশের আয়োজন করা হয়। ফলে সফরের দ্বিতীয় দিনেই জাতিসংঘের শীর্ষ নেতৃত্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
পাঁচ দিনের সফরে সোমবার বিকেলে নিউইয়র্কে পৌঁছান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এটি তার প্রথম সফর। বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তার। এ ভাষণে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘের এই সফরকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে তার সফরের প্রতিবাদে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের কাছে আওয়ামী লীগ ও এর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভের কথাও জানা গেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমুখী কর্মসূচিও দেখা যাচ্ছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে তারেক রহমানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও কর্মসূচি রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে তার প্রথম সাধারণ পরিষদে ভাষণ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক এই বৃহৎ মঞ্চে প্রথম বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংকটের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ।
জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমান একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য। এর আগে তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দিয়েছেন। ফলে পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকেও তার প্রথম জাতিসংঘ ভাষণকে আলাদা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
সফরের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতে সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া প্রাতরাশে অংশ নেওয়ার পর রাতে ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্পের নৈশভোজে যোগ দেন তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান। বিশ্বনেতাদের সম্মানে আয়োজিত এই ধরনের আনুষ্ঠানিক আয়োজন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকেন্দ্রিক কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের পাশাপাশি তাদের সহধর্মিণীরাও অংশ নেন।
নিউইয়র্ক সফরের বাকি সময়েও তারেক রহমানের একাধিক বৈঠক ও কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার সুযোগও পাচ্ছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। ওই দিন রাতে নিউইয়র্ক থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার। এর আগে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে সফরের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন তিনি।
ট্রাম্প-মেলানিয়ার নৈশভোজ এবং গুতেরেসের প্রাতরাশে অংশগ্রহণ দিয়ে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফরের কূটনৈতিক পর্ব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। সামনে সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তার বক্তব্য এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকগুলোতেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার ও সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা রয়েছে।